পায়রা বন্দরের কাজ পাচ্ছে চীন ও ভারত

Print

%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a7%9f%e0%a6%b0%e0%a6%be-%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%9c-%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%9a%e0%a7%8d%e0%a6%9b%e0%a7%87পায়রা বন্দরের চারটি অংশের নির্মাণকাজ পাচ্ছে চীনা ও ভারতীয় কম্পানি। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের গঠিত একটি কমিটি চীন ও ভারতের তিনটি কম্পানিকে কাজ দেওয়ার জন্য বাছাই করেছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে কম্পানিগুলোর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর ঢাকা থেকে পায়রা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের কাজ পাচ্ছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ডিপি-রেল।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী পায়রা বন্দরের মূল অবকাঠামো নির্মাণের কাজ পাচ্ছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত কম্পানি চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পানি লিমিটেড। নদী অববাহিকার নাব্যতা রক্ষা ও পাড় সংরক্ষণের কাজ করবে চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন লিমিটেড। এক হাজার মিটার দৈর্ঘ্যের বহুমুখী টার্মিনাল নির্মাণকাজের জন্য ভারতের ইন্ডিয়া পোর্টস গ্লোবাল প্রাইভেট লিমিটেডের (আইডিজিপিএল) নাম সুপারিশ করেছে কমিটি। এ ছাড়া বন্দর এলাকায় আবাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবার প্রতিষ্ঠানগুলো নির্মাণের কাজ পাচ্ছে চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন লিমিটেড।
পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের (পাবক) চেয়ারম্যান কমোডর মো. সাইদুর রহমান গতকাল বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পায়রা বন্দরের চারটি অংশের নির্মাণে দুটি চীনা কম্পানি ও একটি ভারতীয় কম্পানির সঙ্গে এমওইউ স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুততার সঙ্গে এসব এমওইউ স্বাক্ষর করা হবে। সপ্তাহখানেকের মধ্যেই তা সম্পন্ন হতে পারে।’
গত ৩০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পায়রা সমন্বিত উন্নয়ন কার্যক্রম-সংক্রান্ত এক ভিডিও কনফারেন্সে বলা হয়, স্বল্পতম সময়ের মধ্যে এমওইউ স্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষ থেকে মুখ্য সচিব এ সভা করেন। তাতে সচিবালয় থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান, নৌসচিব অশোক মাধব রায়, জ্বালানিসচিব নাজিমউদ্দিন চৌধুরীসহ পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ওই ভিডিও কনফারেন্সে যোগ দেন।
ওই সভার কার্যবিবরণীতে বন্দরের এ চারটি অংশের নির্মাণ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পায়রা বন্দর নির্মাণ করতে হলে সরকারি পর্যায়ের (জিটুজি) মাধ্যমে পরিকল্পিত অংশগুলোর (কম্পোনেন্ট) ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন। সে জন্য জিটুজির মাধ্যমে চারটি কম্পোনেন্টের বিপরীতে চারটি কম্পানির সঙ্গে দ্রুত এমওইউ করার লক্ষ্যে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটি যাচাই-বাছাই করে সম্পন্ন করে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত যাচাই-বাছাই কমিটি জিটুজি ভিত্তিতে চারটি কম্পোনেন্টের জন্য চীনের চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পানি লিমিটেড, চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন ও ভারতের আইডিজিপিএলের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সুপারিশ করেছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে এসব কম্পানির সঙ্গে দ্রুত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের উদ্যোগ নিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) বলা হয়েছে। এ বিষয়ে অগ্রগতির তথ্য ১০ দিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে জানাতে বলা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, পায়রা বন্দরের আরো চারটি অংশের কাজ বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) মাধ্যমে নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে দুটি কনটেইনার টার্মিনাল, ৫০০ একর জমিতে বাল্ক টার্মিনাল ও ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ। এ চারটি অংশের কাজও চারটি বিদেশি কম্পানিকে দেওয়া হবে। এখন এসব কম্পানির বিষয়ে পিপিপি অফিসের মতামত নিচ্ছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।
ঢাকা-পায়রা রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প সম্পর্কে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফিরোজ সালাহ্ উদ্দিন জানান, ঢাকা থেকে পায়রা বন্দর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে পাওয়া আগ্রহপ্রস্তাব (ইওআই) যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে বিশদ সমীক্ষার কাজ হাতে নেওয়া প্রয়োজন। ভিডিও কনফারেন্সে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যুক্তরাজ্যের ডিপি-রেলের সঙ্গে পিপিপির আওতায় এই রেলপথ নির্মাণ করা হবে। শিগগিরই পিপিপির আওতায় ডিপি-রেলের সঙ্গে এমওইউ স্বাক্ষরের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে রেলপথ মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে।
পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কমোডর সাইদুর রহমান সভায় জানান, মূল চ্যানেল ড্রেজিংয়ের ব্যাপারে গত ২৫ মে বেলজিয়ামের যান ডি নুল এনভির (জেডিএন) সঙ্গে এমওইউ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বন্দরের মূল চ্যানেলের ড্রেজিং কাজের জন্য পোতাশ্রয়ের ভেতরে পাঁচ নটিক্যাল মাইল এলাকায় ১০ মিটার, বহির্চ্যানেলে ১০ নটিক্যাল মাইল এলাকায় ৮ মিটার এবং আউটার চ্যানেলে প্রায় ১০ নটিক্যাল মাইলের নাব্যতা ৯ মিটার করার প্রস্তাব দিয়েছে। এর ফলে পোতাশ্রয়ের জেটিতে প্রায় ১১ মিটার গভীর জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হবে। ফলে বড় ও বেশি গভীরতাসম্পন্ন জাহাজ বন্দরে আসতে পারবে। বেলজিয়ামের কম্পানিটি এখন প্রস্তাব দিয়েছে পিপিপির মডেলে কম্পানি গঠন করে ড্রেজিংয়ের কাজ করবে। এ জন্য একটি কম্পানি গঠন করা হবে, যেখানে ৫১ শতাংশ শেয়ার পাবক ও ৪৯ শতাংশ শেয়ার বেলজিয়ামের কম্পানিটির থাকবে। এতে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষকে ৫১ শতাংশ শেয়ার বাবদ পাঁচ কোটি ৬০ লাখ ডলার ও বেলজিয়ামের কম্পানিটিকে পাঁচ কোটি ৩০ লাখ ডলার দিতে হবে।
পায়রা বন্দর নির্মাণে সাত হাজার একর জমি অধিগ্রহণের প্রশাসনিক অনুমোদন নেওয়া হয়। তাতে ক্ষতিপূরণ ও আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ ২৮৩ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়। তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় গঠিত কমিটি বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ খরচ ৩২০০ কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে। পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, পায়রা বন্দর এলাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মোট ১৬ হাজার একর জমি রয়েছে। সেগুলো অধিগ্রহণে বিদ্যমান জটিলতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে। এ প্রকল্পের জন্য আরো জমির দরকার হলে রাবনাবাদ চ্যানেলের পূর্ব পাশের রাঙ্গাবালি থেকে দেওয়া যেতে পারে।
জ্বালানি বিভাগের সচিব নাজিমউদ্দিন চৌধুরী সভায় বলেন, পায়রা বন্দরে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য যে জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে, তা ব্যয়বহুল হবে। তবে পাবক চেয়ারম্যান কমোডর সাইদুর রহমান জানান, পৃথিবীর একটি নামকরা কম্পানির মাধ্যমে পায়রা বন্দরের মাস্টারপ্ল্যান করা হয়েছে। সব কিছু সে বিবেচনাতেই হচ্ছে। তিনি বলেন, সার্বিক দিক বিবেচনায় মাস্টারপ্ল্যানে চিহ্নিত স্থানেই এলএনজি টার্মিনাল নির্মিত হবে। পাবক জাহাজ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধাসংবলিত ডকইয়ার্ড নির্মাণের জন্য যে স্থান নির্ধারণ করেছে, সেখানে ডকইয়ার্ড নির্মাণে আপত্তি শিল্প মন্ত্রণালয়ের। মন্ত্রণালয় বলেছে, যেখানে ডকইয়ার্ড নির্মাণের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে নাব্যতা অনেক কম। তারা অধিক নাব্যতা থাকায় চারিপাড়াতে ডকইয়ার্ড নির্মাণে আগ্রহী। কিন্তু পাবক চেয়ারম্যান বলেছেন, বন্দরের মূল টার্মিনালগুলো চারিপাড়ায় নির্মিত হবে। আর মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী সব সংস্থাকেই নির্ধারিত স্থানে কাজ করতে হবে।
পায়রা বন্দরে যাতায়াতের সুবিধার জন্য পটুয়াখালীতে একটি বিমানবন্দর নির্মাণের বিষয়ে সভায় আলোচনা হয়। তবে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি জানান, রাস্তা ও লেবুখালী সেতু নির্মাণের কাজ চলছে। ফলে বরিশাল বিমানবন্দর থেকে মাত্র এক ঘণ্টায় পায়রা বন্দরে পৌঁছানো যাবে। তাই আপাতত সেখানে নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের প্রয়োজন হবে না।
এদিকে পায়রা বন্দরের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করতে পণ্যের শুল্কহারে ছাড় দেওয়ার জন্য এনবিআরকে অনুরাধ করেছিল পাবক। বন্দর ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য অন্তত চার-পাঁচ বছরের জন্য শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান জানিয়েছেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে শুল্কহার কমানোর কোনো সুযোগ নেই।
এ বিষয়ে পাবক চেয়ারম্যান জানান, এখনো শুল্কহার কমানোর বিষয়ে চেষ্টা চলছে। আশা করছি, বন্দর ব্যবহারকারীদের শুল্ক ছাড় দেওয়া হবে। এ বিষয়ে এনবিআরকে আবারও অনুরোধ করা হচ্ছে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 42 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ