পুলিশ কেন হঠাৎ মারমুখী

Print

%e0%a6%aa%e0%a7%81%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a6%b6-%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%a8-%e0%a6%b9%e0%a6%a0%e0%a6%be%e0%a7%8e-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%96%e0%a7%80ফুলবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজকে জাতীয়করণের আন্দোলন শুরু থেকেই বিরোধিতা করে আসছেন স্থানীয় এমপি অ্যাডভোকেট মোসলেম উদ্দিন ও তার ছেলে ওই কলেজেরই গভর্নিং বডির সভাপতি অ্যাডভোকেট ইমদাদুল হক সেলিম। এ আন্দোলন দমনে তারা পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এমপি ও এমপিপুত্রের নির্দেশে বিভিন্ন সময় ভাংচুরের ঘটনা ঘটিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর দায় চাপিয়ে দিয়ে পুলিশকে উস্কানি দেওয়া হয়েছে। এসব কারণেই পুলিশ মারমুখী অবস্থান নেয় এবং রোববার দুপুরে নির্দয়ভাবে লাঠিপেটা করায় কলেজশিক্ষক ও এক পথচারীর মৃত্যু হয়। এদিকে, রোববার সংঘর্ষে পুলিশের লাঠিপেটায় শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ ও এক পথচারীর মৃত্যুর ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া ফুলবাড়িয়া পৌর এলাকায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ফুলবাড়িয়া উপজেলা সদর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে ১৯৯৯ সালে বর্তমান এমপি অ্যাডভোকেট মোসলেম উদ্দিন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০০৯ সালে তার ছেলে ইমদাদুল হক সেলিমকে গভর্নিং বডির সভাপতির দায়িত্ব দেন তিনি। মোসলেম উদ্দিন ফুলবাড়িয়ার তিনটি কলেজের জন্য ডিও লেটার দিলেও ছেলের কলেজের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন তিনি। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এমপি মোসলেম উদ্দিন, তার ছেলে ইমদাদুল হক সেলিম ও ফুলবাড়িয়া পৌরসভার মেয়র গোলাম কিবরিয়ার মদদে পুলিশ আন্দোলনকারীদের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। তারা জানান, আন্দোলনের শুরুতে পুলিশ শান্তিপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে এমপিপুত্র সেলিম পরিচালিত আখালিয়া হেলথ সেন্টারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ভাংচুরের ঘটনার পর সেলিম পুলিশের ওপর ক্ষিপ্ত হন। এর পরেই পুলিশ কলেজ জাতীয়করণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মারমুখী অবস্থান নেয়।
এ ব্যাপারে ফুলবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজ সরকারিকরণ দাবি আদায় কমিটির আহ্বায়ক এস এম আবুল হাসেম, যুগ্ম আহ্বায়ক রুহুল আমিন ও সদস্য সচিব ইকবাল হোসেন জানান, গত বৃহস্পতিবার কলেজের ছাত্র-শিক্ষকের অবরোধের কারণে এমপি মোসলেম উদ্দিন উপজেলার আখালিয়া নদীর ওপর ব্রিজ উদ্বোধন করতে যেতে পারেননি। পরে তার ছেলে সেলিমের নির্দেশে কিছু দুর্বৃত্ত আখালিয়া হেলথ সেন্টার, অ্যাম্বুলেন্সসহ মোটরসাইকেল ভাংচুর করে। এর দায় আন্দোলনকারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
অভিযোগ প্রসঙ্গে স্থানীয় এমপি অ্যাডভোকেট মোসলেম উদ্দিন সমকালকে বলেন, কলেজের জাতীয়করণ নিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে অনেকবার বসার চেষ্টা করা হলেও তারা এ ব্যাপারে কোনো সাড়া দেননি। পুলিশের উস্কানি দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি উস্কানি দিতে যাব কেন। আন্দোলনকারীদের হঠকারী আচরণের কারণেই পুলিশ এমন মারমুখী হয়েছে। পুলিশের লাঠিপেটায় যদি শিক্ষক আজাদের মৃত্যু হয়, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আমিও এর বিচারের দাবি জানাচ্ছি।’
এ ব্যাপারে অ্যাডভোকেট ইমদাদুল হক সেলিম বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জাতীয়করণের জন্য উপজেলার তিনটি কলেজের নাম চাওয়া হলে এমপি প্রথম ফুলবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজ, দ্বিতীয় বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা কলেজ ও তৃতীয় ফুলবাড়িয়া মহিলা কলেজের নাম দেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় নাম চূড়ান্ত করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠালে প্রধানমন্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা কলেজের জাতীয়করণের জন্য অনুমোদন করেন। তার মদদে ভাংচুরের বিষয়ে তিনি বলেন, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। তারা নিজেরাই দোষ করে অন্যের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে।
আন্দোলনকারী শিক্ষকরা জানান, ঐতিহ্যবাহী ফুলবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজ ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিশ্রুতিশীল শিক্ষকদের দিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছে। ১৯৮০ সালে এ কলেজ এমপিওভুক্তির পর ১৯৮৬ সালে ডিগ্রি কলেজে উন্নীত হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা কলেজের প্রতিষ্ঠা সভাপতি পদ ছেড়ে এমপি মোসলেম উদ্দিন ছেলেকে গভর্নিং বডির সভাপতির দায়িত্ব দেন এবং এমপি নিজে ফুলবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজের সভাপতি হন। গত বছর উপজেলা সদরে কলেজ পর্যায়ে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে এমপি তিনটি কলেজের নাম দিলেও বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা কলেজের পক্ষে অবস্থান নেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। দেড় মাস আগে ফুলবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজকে বাদ দিয়ে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা কলেজকে জাতীয়করণ করায় ফুলবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কলেজ জাতীয়করণের দাবিতে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন শুরু করেন। এ আন্দোলনের পর থেকে কলেজ অধ্যক্ষ এমপিপুত্র সেলিমের ভায়রা নাসির উদ্দিন খান ছুটিতে চলে যান। তিনিও নেপথ্যে থেকে আন্দোলনের বিরোধিতা করছেন।
আন্দোলনকারী শিক্ষকরা আরও জানান, বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা কলেজ ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও ২০০৮ পর্যন্ত এর সব কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই পুনরায় কলেজটি পাঠদানের অনুমতি পায়। ২০০৯ সালের পর থেকে কলেজটি সরকারিকরণের আগপর্যন্ত নন-এমপিওভুক্ত ছিল। বর্তমানে ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা কলেজে ৩৪৩ শিক্ষার্থী ও ২৯ শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। অন্যদিকে, উপজেলার বৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফুলবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজে বর্তমানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী রয়েছে পাঁচ হাজার। শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ১৭৫ জন। এ ছাড়া বি এম শাখাসহ আটটি বিষয়ে অনার্স পাঠদান চালু রয়েছে।
কলেজশিক্ষক ইকবাল হোসেন বলেন, বর্তমান কলেজের অধ্যক্ষ এমপিপুত্র সেলিমের ভায়রা নাসির উদ্দিনের ২০১২ সালে ডিসেম্বরে চাকরি শেষ হয়। প্রথমে কলেজ সভাপতি তাকে দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক প্রতি মাসে ৬৫ হাজার বেতন-ভাতায় নিয়োগ দেন। পুনরায় মেয়াদ শেষে আবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ দুই বছর বৃদ্ধি করেন। তৃতীয়বার আবার চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করে নিয়োগ দেওয়া হয়। সে কারণেই তিনি আন্দোলনে সম্পৃক্ত না হয়ে এমপি ও এমপিপুত্রের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
তিনটি তদন্ত কমিটি: পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে এক শিক্ষকসহ দু’জন মারা যাওয়ার ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গতকাল সচিবালয়ে একটি অনুষ্ঠান শেষে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) শামসুল হুদাকে প্রধান করে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এরই মধ্যে কমিটির একজন সদস্য ঘটনাস্থলে গেছেন বলে জানান তিনি। একই ঘটনায় ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) আরিফ আহমেদকে প্রধান করে তিন সদস্যের অপর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন জেলা প্রশাসক। এ কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশের আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নূরে আলমকে প্রধান করে তিন সদস্যের এ কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
পুলিশ পাহারায় শিক্ষক আজাদের লাশ দাফন: ফুলবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদের লাশ রোববার রাতে ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল ভোরে পুলিশ পাহারায় নান্দাইল উপজেলার মোয়াজ্জেমপুর ইউনিয়নের কাদিরপুর পশ্চিমপাড়া গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেখানে স্থানীয় ফুরকানিয়া মাদ্রাসা মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়েছে। ফুলবাড়িয়া পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারির ফলে আন্দোলনরতরা তাদের প্রিয় শিক্ষক নিহত আবুল কালাম আজাদের জানাজা কলেজ মাঠে পড়তে না পেরে পৌর এলাকার বাইরে জোরবাড়িয়া কাছারি মাঠে গায়েবানা জানাজা পড়েন।
বিভিন্ন সংগঠনের নিন্দা: পুলিশের লাঠিপেটায় ফুলবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ ও পথচারী ভ্যানচালক সফর আলী হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। গতকাল পৃথক বিবৃতিতে এসব সংগঠনের নেতারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও বিচারের দাবি জানান। বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন- শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, কলেজ শিক্ষক সমিতি, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতি, প্রধান শিক্ষক সমিতি ও বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষক সমিতির নেতারা। এ ছাড়া বাংলাদেশ লেখক শিবির ও বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের নেতারা পৃথক বিবৃতিতে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি দাবি করেন।
প্রতিবাদে শিক্ষক সমাবেশ: পুুলিশের লাঠিপেটায় ফুলবাড়িয়া কলেজ শিক্ষকের মৃত্যুর প্রতিবাদে বাংলাদেশে কলেজ শিক্ষক সমিতির (বাকশিস) উদ্যোগে গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সমাবেশ থেকে ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে কলেজ শিক্ষাসহ সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবি জানানো হয়। বাকশিস সভাপতি অধ্যক্ষ একেএম আসাদুল হকের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের উপদেষ্টা অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ, অধ্যক্ষ ফয়েজ হোসেন, অধ্যক্ষ কানাই লাল সরকার, জাকির হোসেন, ইয়াসমিন আরা খানম, অনিন্দিতা রায় প্রমুখ। সমাবেশ থেকে আগামী শনিবার জেলা পর্যায়ে বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দেওয়া হয়।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 45 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ