ফরম ফিলাপের নামে চলছে ওপেন সিক্রেট বাণিজ্য

Print

%e0%a6%ab%e0%a6%b0%e0%a6%ae-%e0%a6%ab%e0%a6%bf%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%87-%e0%a6%9a%e0%a6%b2%e0%a6%9b%e0%a7%87-%e0%a6%93%e0%a6%aa%e0%a7%87সব কিছু ঠিক থাকলে ২০১৭ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হবে আগামী ২ ফেব্রুয়ারি। এই পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে এখন চলছে পরীক্ষার্থীদের ফরম পূরণ কার্যক্রম। এ ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত অর্থ আদায় না করতে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার সতর্ক করে দিয়েছেন খোদ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। গত সোমবারও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বলা হয়েছে, পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে যেন অতিরিক্ত অর্থ আদায় না করা হয়। এ বিষয়ে আদালতেরও সুনির্দিষ্ট আদেশ রয়েছে। কিন্তু শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষামন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের তথা সরকারের এবং আদালতের আদেশ-নির্দেশ উপেক্ষা করে রাজধানীর অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই ফরম ফিলাপের নামে চলছে ওপেন সিক্রেট বাণিজ্য; আদায় করা হচ্ছে পাঁচ-ছয়গুণ বেশি ফি। মহানগরীর বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া গেছে। একাধিক বিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষকও নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেছেন ফরম পূরণের নামে সরকার নির্ধারিত ফির পাঁচ-ছয়গুণ বেশি অর্থ আদায় করা হচ্ছে। বেশ কয়েকজন অভিভাবক আমাদের সময়ে ফোন করে এ নিয়ে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কর্তৃপক্ষের আইনি জ্ঞান আবার বেশ টনটনে। তাই কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা আদায় করেও শিক্ষার্থীদের দেওয়া হচ্ছে না অর্থপ্রাপ্তির কোনো রশিদ। এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে বলা হচ্ছে, বিক্ষোভকারীদের পরীক্ষা দিতে দেওয়া হবে না। রাজধানীর একে উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে গত ১০ নভেম্বর ছিল এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ফরম পূরণ করার ধার্যকৃত দিন। সেদিন প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক পরীক্ষার্থীর অভিভাবকই ক্ষুব্ধ। একাধিক অভিভাবক জানান, সেখানে ফরম পূরণ বাবদ স্কুল কর্তৃপক্ষ সর্বশেষ ধার্য করেছে ন্যূনতম ৫ হাজার ৬০০ টাকা। প্রাথমিকভাবে প্রায় ৮ হাজার টাকা ধার্য করা হয়েছিল। কিন্তু অভিভাবকদের ক্ষোভের মুখে পড়ে তা কমিয়ে ৫ হাজার ৬০০ টাকায় নামিয়ে আনা হয়। অথচ এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ফরম পূরণে সরকার নির্ধারিত ফি মাত্র ১ হাজার ৬৮৫ টাকা। যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরিস্থিতি আরও খারাপ। এই প্রতিষ্ঠান থেকে এবার ৬ শতাধিক শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে। গত দুদিন প্রতিষ্ঠানটির একাধিক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফরম ফিলাপের নামে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে রমরমা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। এ উপলক্ষে এবার তাদের টার্গেট প্রায় অর্ধকোটি টাকা। শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশ উপেক্ষা করে মানবিক ও ব্যবসা বিভাগের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ৭ হাজার ৮০০ টাকা। আর বিজ্ঞান বিভাগে নেওয়া হচ্ছে ৮ হাজার ৩০০ টাকা। আর যারা টেস্ট পরীক্ষায় কোনো এক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের গুনতে হচ্ছে ওই পাঁচ-ছয়গুণ টাকার পরও বাড়তি এক হাজার টাকা। যারা ৩-৪ বিষয়ে ফেল করেছে, সেসব পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে আরও অনেক বেশি ফি। দুর্বল শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ আদায়কে টার্গেটে রেখে স্কুল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রভাবশালী একটি মহলের সমন্বয়ে রীতিমতো একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে খোদ স্কুলেই; একজন পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে ৩০-৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। মোটা টাকা আদায়ে অনেক শিক্ষার্থীকে ইচ্ছা করে বিভিন্ন বিষয়ে অকৃতকার্য করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে স্কুল কর্তৃপক্ষের এমন হরিলুটি কারবারে চোখে অন্ধকার দেখছেন দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির অভিভাবকরা। অর্থাভাবে ফরম পূরণ করতে না পেরে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন চোখ ভরা জল নিয়ে। জানা গেছে, দরিদ্র অভিভাবকদের কেউ কেউ সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে চড়া সুদে টাকা এনে ফরম পূরণের ব্যবস্থা করছেন। গত দুদিন যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণ ঘুরে, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। এ নিয়ে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা চরম হতাশা প্রকাশ করলেও শিক্ষা বোর্ড বা প্রশাসনের কার্যকর কোনো নজরদারি চোখে পড়েনি। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. মাহবুবুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, ‘এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ কার্যক্রমে কোনো কোনো স্কুল কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি টাকা আদায় করছে বলে আমরাও অভিযোগ পাচ্ছি। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবগত করা হয়েছে। গত ১৪ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও এক সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছে, সরকারি বিধিবিধানের পরিপন্থীভাবে অতিরিক্ত আদায়কৃত অর্থ অবিলম্বে শিক্ষার্থীদের ফেরত দিতে হবে। অন্যথায় ম্যানেজিং কমিটি বাতিলসহ প্রতিষ্ঠান প্রধানদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। চিহ্নিত এসব প্রতিষ্ঠানের তালিকা ধরে বর্তমানে মাঠপর্যায়ে তদন্ত কার্যক্রম চলছে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি আদায়কারী হিসেবে যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল হাই স্কুল ও কলেজের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের সত্যতা পেলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা বলছেন, ওপেন সিক্রেট ডাকাতি করছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। একটু খোঁজ নিলে যে কেউ তা জানতে পারবে। সরকার মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান চালালে সহজেই এ সবের প্রমাণ পাবে। শুধু প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা। গতকাল যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুলে কথা হয় এসএসসি ফরম পূরণ করতে আসা শিক্ষার্থী তানভীর হোসেন ও তার বাবা জাকির হোসেনের সঙ্গে। ফরম ফিলাপে কত টাকা দিতে হয়েছে এমন প্রশ্নে তারা বলেন, শিক্ষকরা ৮ হাজার ৩০০ টাকা দিতে বলেছেন। তা-ই দিয়েছি। একই প্রসঙ্গে বুধবার দুপুরে স্কুল প্রাঙ্গণে কথা হয় ১৩৭ নম্বর রোলধারী শিক্ষার্থীর ব্যবসায়ী বাবার সঙ্গে। তিনিও অভিন্ন মন্তব্য করে বলেন, স্যাররা যা চান, তা না দিয়ে কী উপায় আছে। সন্তানের ভবিষ্যৎ ভেবে আপাতত কোনো ঝামেলায় জড়াতে চাচ্ছি না। কিন্তু বিপত্তি ঘটেছে ফুটপাতের কলা বিক্রেতা দরিদ্র নান্নু মিয়ার মেধাবী ছেলে শহীদুল ইসলামের ক্ষেত্রে। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার স্বপ্ন দেখা শহীদুল এবারের এসএসসি পরিক্ষার্থী। কিন্তু তার স্বপ্নের পথের শুরুতেই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আর্থিক সীমাবদ্ধতা। অভাবের সংসার তাদের। সংসার-ব্যয় মিটিয়ে তার বাবার পক্ষে এত টাকা ফি দেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই শিক্ষার্থীর নানি গতকাল এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘সরকারি হিসাবে পরীক্ষার ফি ১ হাজার ৮০০ টাকা। অথচ ৩ দিন হলো ২ হাজার টাকা নিয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য শিক্ষকের কাছে ধরনা দিয়েও নাতির ফরম ফিলাপ করাতে পারলাম না। প্রধান শিক্ষক সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ৮ হাজার টাকার এক টাকা কমেও হবে না। গতকাল মরিয়ম আপার (সহকারী প্রধান শিক্ষিকা) হাতে-পায়ে ধরেছি। কোনো কাজ হয়নি। আপা দুঃখ করে বলেছেন, তুমি তো জান, আমাদের কাছে কোনো ক্ষমতা নেই। হেড স্যার বললে হয়তো তোমারটা করানো যেতে পারে। এদিকে চড়া সুদেও কেউ টাকা দিচ্ছে না। কী করে যে নাতির ফরমটা ফিলাপ করাব সেই চিন্তায় চোখে অন্ধকার দেখছি। মনে হচ্ছে শেষ পর্যন্ত নাতির পরীক্ষাই দেওয়া হবে না। শাড়ির আঁচলে চোখের জল মুছতে মুছতে স্কুল ছেড়ে যান তিনি। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে গতকাল একঝাঁক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও তাদের স্বজনরা গতকাল ঘিরে ধরেন এই প্রতিবেদককে। তুলে ধরেন তাদের বিস্তর অভিযোগ। জানান, গতবারও ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা নিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। পরে আদালত সে টাকা শিক্ষার্থীদের কাছে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে ফেরত দেওয়া হয়নি অতিরিক্ত আদায়কৃত টাকা। বাড়তি টাকা আদায় প্রসঙ্গে সরাসরি অভিযোগ জানানোর সুযোগ না থাকায় সবকিছু স্কুলের চার দেয়ালেই বন্দি হয়ে থাকছে। একাধিক বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী জানান, সরকার এ বিষয়ে নজর না দিলে তারা অচিরেই আন্দোলনে নামবেন। একে উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজই শুধু নয়, রাজধানীর প্রায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে একই তথ্য পাওয়া গেছে। এভাবে চলতে থাকলে সামনে এমন সময় আসবে যখন মেধাবী হলেও দরিদ্র জনগোষ্ঠী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণে অপারগ হয়ে পড়বেÑ এমন আক্ষেপও শোনা গেছে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের কণ্ঠে। স্কুলটির শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে অনেক খুঁজেও গতকাল দুপুরে যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে অবস্থানকালে দেখা মেলেনি স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবু ইউসুফের। পরে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগোযোগ করা হলেও ওপাশ থেকে সাড়া দেননি তিনি। একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটির সহকারী প্রধান শিক্ষিকা মরিয়ম বেগমের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে আমাদের সময়কে বলেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সরকারি নির্ধারিত ফির চেয়ে কোনো বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে না। টাকার কারণে কোনো শিক্ষার্থীর অভিভাবককে ফেরত পাঠানো হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 81 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
error: