বাস সার্ভিসের চরম অব্যবস্থাপনা

Print
সহজ এবং সুলভে পরিচিত পরিবহন হলো বাস। আর দৈনিক এই বাস সার্ভিসের উপর নির্ভর করতে হয় লক্ষ লক্ষ মানুষকে। সব কিছুর দাম বাড়ার সাথে বাস ভাড়া কখনও দ্বিগুণ কখনও সামান্য হলেও দাম বেড়েছে। কিন্তু কোন পরিবর্তন হয়নি বাস সার্ভিসের সেবার মান।

নিজের পকেটের টাকা খরচ করে কখনও বাসের অব্যবস্থাপনা থেকে পেতে হয় নানা অনভিপ্রেত অভিজ্ঞতা। যা কখনও কখনও মানুষের জীবনকে দূর্বিষহ করে তোলে। লোকাল কিংবা দূরপাল্লার যে কোন বাসে যাতায়াত করা মানুষের আচরণ আর বাস সার্ভিস দেওয়া দায়িত্বে থাকা মানুষের আচরণ ভয়াবহ রকম হয়ে থাকে। কিন্তু কেন আমরা এমন অনাকাংক্ষিত মানুষ হয়ে এমন সব পরিস্থিতি তৈরি করি? এর পেছনে যৌক্তিক কারণগুলো কী?

বাসে যাতায়াত করা অধিকাংশ মানুষ বাস সার্ভিস এবং বাসে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর প্রতি ঘৃণা কিংবা বিরক্ত থাকে। অনেক ঘৃনা আর বিরক্তি নিয়েও মানুষ বাধ্য হয় বাসে যাতায়াত করতে।

 

img_20161026_104251
( বাসে ফ্যান আছে বাতাস নেই)

আমাদের দেশে অনেক ধরনের উন্নয়ন হচ্ছে। কিছু উন্নয়ন অনেকটা অপরিকল্পিত। যাই হোক বাস সার্ভিসে সাধারনত যে সমস্যা গুলো দেখা যায়-

১) অনেক পুরনো ভাঙা এবং ফিটনেস বিহীন বাস চলাচল।
২) সিট বন্টন, সিট সেটিংস, এবং সিটের সৌন্দর্যহীনতা।
৩) বাসে ফ্যান কিংবা এয়ারকন্ডিশন থাকা সত্ত্বেও বাস ড্রাইভার এবং কন্ডাক্টর চালায় না।
৪) সিটিং সার্ভিস থাকা সত্ত্বেও জায়গায় বাস থামা। অযথা সময় ব্যয় করে যাত্রী তোলা।
৫) বাসে ধুমপান করা।
৬) বাসে খাওয়া এবং নানা রকম প্যাকেট, কাগজ অথবা যেকোন ময়লা দিয়ে বাসের পরিবেশ নষ্ট করা।
৭) বাস ড্রাইভার, কন্ডাক্টরসহ যাত্রীদের মোবাইলে কথা বলা।
৮) যাত্রীদের সাথে বাস ড্রাইভার এবং কন্ডাক্টরের অসৌজন্যমূলক আচরনণ। অনেক সময় যাত্রীরাও অসৌজন্যমূলক আচরণ করে।
৯) বাস ড্রাইভারের মানসিক অসুস্থতা। শারিরীক এবং মানসিকভাবে সুস্থতা যাচাই না করে বাস ড্রাইভ করা। কেউ মাদকাসক্ত থাকে, বদ রাগী কিংবা যে কোনো শারিরীক সমস্যা নিয়ে বাস ড্রাইভ করা ।
১০) বাসে যখন তখন ভিক্ষুক উঠে যাওয়া। মার্কেটিংয়ের জন্য হকার উঠে যাওয়া। বর্তমান অনিরাপদ পৃথিবীর জন্য ভয়াবহ ব্যাপার।
১১) বাসে অনেক যাত্রী সেফ, কফ এবং বমি ভেতরেই ফেলে। বাসে কোন ধরনের ব্যবস্থা থাকে না।
১২) রাস্তায় দায়িত্বরত আইনশৃংখলা বাহিনীর দায়িত্বহীনতা এবং অসততা।

 

img_20161026_122426
(মহিলা সিট নামের অবিবেচনা)

কেস স্টাডি ১:

একবার রাজধানির সিটি বাসে করে গুলিস্তানে যাচিছ। সেখান থেকে হয়তো অন্য কোথাও যাবো। সায়েন্সল্যাব থেকে বাসে উঠলাম। উঠানোর সময় কনডাক্টর বলল বাসে জায়গা হবে বা আছে। তাড়াহুড়ো করে উঠে যাওয়াতে পড়লাম মহাবিপদে। আমি উঠতেই বাস ছেড়ে দিয়েছে। নেমে যেতেও পারছি না। মনে হচ্ছিল মানুষের চাপে আমি ভর্তা হয়ে যাচ্ছি।

আর বাসে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষ কিংবা নারীরা যে ঐ সময়টুকু কি পরিমান অসহায় থাকে শুধু সে মানুষগুলোই জানে । দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের হাতে ভারি কোন কিছু থাকলেও পাশেই বসে থাকা মানুষগুলো সামান্য সৌজন্য কিংবা সহযোগীতা করবে না। দাঁড়ানো থাকা মানুষটির প্রতি অবজ্ঞা কিংবা ভিন্ন দৃষ্টিপাত করবে। ব্যাপারটা এমন যে ’আমি সৌভাগ্যবান বাসে সিট পেয়েছি, তুই দুর্ভাগা দাঁড়িয়ে আছিস। আমার আরামে বসে থাকার সৌভাগ্য নষ্ট করবি না।’ এমন মনোবৃত্তি নিয়ে নানা সন্দেহ নিয়ে দাড়িয়ে থাকা মানুষটির দিকে তাকাবে। বাসে যতো ধাক্কা লাগুক বসে থাকা মানুষটির গায়ে যেনো সামান্য বাতাসও না লাগে। সার্ভিসে পার্থক্য থাকলেও ভাড়া সবার জন্য সমান।

 

কেস স্টাডি ২:
প্রায় সব বাসেই মহিলা সিট থাকে। প্রতিবন্ধি, অসুস্থ মহিলা, শিশুদের জন্য আলাদা সিট থাকার বিষয়টি পৃথিবীর সব দেশেই আছে। কিন্তু আমাদের দেশে এই সিটগুলোর ব্যবহার সত্যিই মানুষের নানা রকম স্বার্থপর মনোবৃত্তি এবং অবিবেচক মানসিকতার প্রকাশ ঘটায়। একবার বিক্রমপুর মুন্সিগঞ্জ থেকে গুলিস্তান নামি। তারপর ধানমন্ডি আসার বাসে উঠি। যথারীতি মহিলা সিটে বসেছি। আমার সিটের সামনেই দু’জন মহিলা বসা।

একটি মহিলা সিটে তিন-চারজন বসে। আমার সামনের সিটে দুজন মহিলা বসেছে। কিন্তু সামনের সিটের বাম পাশের মহিলাকে আমার বেশ স্বার্থপর মনে হলো। খানিকটা অবিবেচকও। একজন বয়স্ক লোক ভারী অফিস ব্যাগ নিয়েই পাশে দাঁড়ানো। ভদ্রলোক ধাক্কাধাক্কির কারনে ব্যাগটা মহিলার সিটের পাশের খালি জায়গায় রেখেছে। কিছুক্ষন পর দেখি মহিলা ব্যাগটা রাখার দায়ে তাকে চোখ রাঙাচ্ছে। মহিলা হওয়ার কারনে সে পুরো সিট সে কিনে নিয়েছে। একজন বয়স্ক লোকের সাথে কেমন ব্যবহার হওয়া উচিত তা সে করেনি। সারা রাস্তা সে ব্যাগটা নিয়ে কষ্ট করে গেলো।

আমরা লিখতে বা বলতে ভাল ভাল কথা বলি। জীবনে বড় বেশি স্বার্থপর কিংবা অবিবেচক। উল্টা ঘটনাও আছে। অনেক সময় মহিলা সিটে পুরুষ বসে থাকে। অনেক সময় মহিলা এলেও সিট ছাড়ে না।

 

img_20161026_104243
(ফ্যানগুলো শুধুই ফ্যাশন)

কেস স্টাডি ৩:
এই ঘটনাটা নারায়ণগঞ্জের। আনন্দ নয়তো বন্ধন বাসে। এখন মনে নেই। এক মহিলা তার পাশের সিটের পুরুষের সিটের পুরুষের গায়ে নিয়ন্ত্রনহীন বমি করে ফেলে। তাতে প্রথমে ঐ পুরুষের বউ ক্ষেপে। তারপর ঐ পুরুষ লোকটি ক্ষেপে কন্ডাকটারের উপর রাগ ঢালতে গিয়ে তুমুল গন্ডগোল বাধে। সেই সাধারণ ঘটনা মারামারিতে রূপ নেয়। এক সময় বাস থেকে নেমে বুড়িগঙা পার হতে হয় লঞ্চে। নৌপথে ফিরতে হয় গন্তব্যে।

কেস স্টাডি ৪:

ঢাকা টু মুন্সিগঞ্জ বাস রুটে একটি মাত্র বাস সার্ভিস তা হলো ‘দিঘীর পার বাস’। কী পরিমান বাস সার্ভিসে সমস্যা, যারা প্রতিদিন যাতায়াত করে তারা জানে। বাসে ফ্যান থাকা সত্ত্বেও তারা ফ্যান নষ্ট অজুহাত দেখিয়ে ফ্যান বন্ধ রাখে। আর বাসগুলোর সিট নোংরা ময়লা। একবার এক অসুস্থ মহিলা বাসে অনেকবার ফ্যান চালানোর কথা বললেও তারা কোন ভ্রুক্ষেপ করেনা। মধ্য পথে মহিলা আরো অসুস্থ হয়ে পড়লে তার আত্মীয় তাকে নিয়ে নেমে যায় হাসপাতালে ভর্তি করার জন্য। এমন প্রতিদিন আমরা চেনা স্বার্থপরতা নিয়ে বেচেঁ থাকি।

img_20161026_104248(সিটিং সার্ভিস নামে দরজা খোলা সব সময়)

কেস স্টাডি ৫:

সিটিং সার্ভিস হওয়ার পরও বাস পথে পথে থামিয়ে যাত্রী বাস ড্রাইভারদের পুরনো অভ্যাস। এমন ঘটনার জন্য বাসে দেরি হওয়াতে আমার এক ফ্রেন্ড বিসিএস ভাইভাতে অংশ গ্রহন করতে পারেনি। পরে সে বিদেশে স্কলারশিপে চলে যায়। আমার আরেক পরিচিত তার বাবার মৃত্যুর সময়ে উপস্থিত থাকতে পারেনি।

কেস স্টাডি ৬:
পদ্মা বাসে হাজিগঞ্জ থেকে ঢাকা পথে। ঘটনাটা কুমিল্লায়। এর আগে দেখলাম বাস ড্রাইভারের আচরনটা একটু উন্মাদ ধরনের। চলন্ত বাসে কি যেনো বিষয় নিয়ে কনডাক্টরের সাথে কথা বলছে।আবার হেলে দুলে হাসাহাসি করছে। কিছুক্ষন পরপর মোবাইলে কথা বলছে। আবার হাইওয়েতে অন্য বাস গুলোর সাথে প্রতিযোগীতা কারে দ্রুত গতিতে বেপরোয়া গাড়ি চালাচেছ।
কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট পার হতে না হতেই রাস্তা ক্রস করা প্রাইভেট কারকে চাপা দিতে গেলে প্রাইভেট কারের চালক বামে টার্ন নেয়। তা না হলে চারজন যাত্রী সেদিন বাস চাপায় শেষ হয়ে যেতো।

এমন অজস্র ঘটনা আছে। মানুষের মানসিকতা এবং অব্যস্থাপনার জন্য এক কাজের জন্য দুইজন মানুষের প্রয়োজন হয়। আমেরিকা, কানাডা,জাপান অনেক উন্নত দেশেই দেখেছি বাসে কোন কন্ডাক্টরের প্রয়োজন নেই। মানুষ ঠিক মতো টিকিট কাটছে। ঠিক মতোই সিটে বসছে। কোন শব্দ নেই। সুন্দর মানসিকতা নিয়ে ড্রাইভার ড্রাইভ করে। সে সব দেশেও দূর্ঘটনা হয়। সেগুলোর ধরন আলাদা। ব্যতিক্রম কখনও উদাহরন হতে পারে না।

সমাধানে পদক্ষেপ :

১) ফিটনেস বিহীন বাসগুলোর যথাযথ মনিটরিং করা।
২) বাসে ধুমপান, মোবাইল, অযথা উচ্চবাচ্য, ড্রাইভারের সাথে কথা বলে মনোযোগ বিঘ্ন করা থেকে বিরত থাকা।
৩) বাসে ভিক্ষুক বা হকার উঠা নিষেধ করতে হবে।
৪) ড্রাইভারের মানসিক এবং শারিরীক সবাস্থ্য যথাযথ পরিক্ষা করে লাইসেন্স দেওয়া।কিছুদিন পর পর মনিটরিং করা।
৫) বাসের সিটিং সার্ভিস মনিটরিং করা।
৬) বাসের গতি ঠিক রাখা। তা ট্রাফিক পুলিশের যথাযথ মনিটরিং করা। কঠিন আইন প্রয়োগ করা।
৭) বাসে চলাচলে নিয়ম মেনে চলা, ভদ্রতা এবং শিষ্টাচার বজায় রাখতে সংসকৃতি গড়ে তোলা। মিডিয়ায় এই বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা। গল্প, উপন্যাস, লেখা, টক শো, বিল বোর্ড থেকে স্কুল, কলেজ, অফিস আদালত সব জায়গায় সচেতনতা তৈরি করা।

আমার আর আপনার সচেতনতাই পারে এই দেশটাকে সুন্দর ও সমৃদধ করতে। আসুন নিজেদের দেশটাকে নিজের বানানো বাড়ির মতোই গুছিয়ে রাখি। সব সময় সুন্দর রাখি। কিছু উন্নত দেশের বাসের তুলনামূলক ছবি ইন্টারনেট থেকে দিলাম।

images-3
(ব্রিটিশ বাস)

images-6
(কানাডিয়ান বাস)

images
(জাপানি বাস)

images-5
(ফরাসি বাস)

images-1
(আমেরিকান বাস)

images-4
(সুইজারল্যান্ডের বাস)

images-2
(সৌদিয়ান বাস)

আশা করি আমরাও একদিন বাস সার্ভিসে পরিবর্তন আনতে পারবো। বিশ্ব উন্নত দেশের মতো আমাদের দেশের বাস ড্রাইভাররা নিয়ম মেনে চলবে। বাসগুলো আপন সৌন্দর্যে মহিমান্বিত হবে।
আমাদের গর্বের জায়গা গুলো আরও সমৃদ্ধ হবে। এই জন্য প্রতিটি নাগরিককে সচেতন এবং দায়িত্বশীল হতে হবে এই দেশ আমার, আপনার, সবার। আসুন সবাই মিলে দেশটা আরও একটু সমৃদ্ধ করি।

(লেখক এবং গবেষক)
সাহিত্য সম্পাদক

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 69 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ