বাড়িভাড়াতেও মেয়েদের ঝক্কি

Print

.‘বিয়া কইরা ফালান। ঢাকায় একলা মাইয়া মানুষ নিরাপদ না।’ ঢাকার মধ্য বাড্ডায় বাড়িভাড়া খুঁজতে গিয়ে সেই বাড়ির দারোয়ানের বিয়ে করার উপদেশ শুনে গেট থেকেই ফিরে আসতে হয়েছিল দীপিকা সাহাকে। ঢাকায় বাড়ি ভাড়া করে থাকার প্রয়োজন এবং আর্থিক সংগতি থাকা সত্ত্বেও এ রকম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে অসংখ্য মেয়ের।সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত বিভিন্ন জঙ্গি হামলার ঘটনার পরে বাড়িওয়ালারা নড়েচড়ে বসেছেন। অনেক ব্যাচেলরের অভিযোগ, তাঁদের বাড়িভাড়া পেতে ব্যাপক ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। এ নিয়ে লেখালেখিও হচ্ছে বিস্তর। মেয়েরাও যে নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।অতিরিক্ত ভাড়া দাবি, কয়েক মাসের অগ্রিম ভাড়া দাবি, অশ্লীল মন্তব্য, অযাচিত উপদেশ বাড়ি ভাড়া নিতে গেলে এ রকম নানা ভোগান্তির শিকার হতে হয় সিঙ্গেল মেয়েদের।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড ক্রিমিনাল জাস্টিস বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী অদিতি ঢাকার ফার্মগেটে একটি বাড়িতে ভাড়া থাকেন। ‘একবার ইন্দিরা রোডের এক বাড়িওয়ালা বলেছিলেন যে মেয়েদের বাড়িভাড়া দিলে ছেলেঘটিত নানা সমস্যা হয়। এ কারণে তিনি মেয়েদের ভাড়া দেন না,’ বলেন অদিতি। একটি টেলিকম কোম্পানিতে খণ্ডকালীন চাকরিরত মাহফুজা কনার কাছ থেকে জানা গেল তাঁর অভিজ্ঞতা। ‘বাড্ডা লিংক রোডের এক বাসায় আমরা কয়েকজন মেয়ে একসঙ্গে থাকতাম। মাসে সাত-আট দিনই পানি পেতাম না। অভিযোগ করলে বলতেন যে আমরা মেয়েরা পানি খরচ করি বেশি। বাড়ির মালিকের নির্দেশ ছিল সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় জুতো খুলে নিঃশব্দে উঠতে হবে।’

একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত   আয়েশা সিদ্দিকা জানান, এক পরিবারের সঙ্গে সাবলেট থাকার এক মাসের মধ্যেই তাঁকে নতুন বাড়ি খুঁজতে হয়েছিল। বাড়িওয়ালা তাঁর দিকে বাজে ইঙ্গিত দিতেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবাসিক-সুবিধা না থাকায় অনেক মেয়েদের ক্যাম্পাসের আশপাশে বাড়ি ভাড়া করে থাকতে হয়। ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী দিলারা জামান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমাদের অন্য ফ্ল্যাটের চেয়ে বেশি ভাড়া দিতে হতো। কারণ, জিজ্ঞাসা করায় বাড়িওয়ালা বলেছিলেন, মেয়েদের বাসা ভাড়া দিয়েছেন এই তো বেশি। ভাড়াও তাই বেশি।’

ধানমন্ডির বাসিন্দা শিশিরের মতে, ‘ আমার বাবা-মা ঢাকায় থাকেন। তবুও আমি আমার কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতের সুবিধার   কারণে আলাদা বাসা ভাড়া নিয়েছি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানিয়া হকের মতে, আমাদের সমাজে কোনো মেয়ে একা থাকে মানেই ধরে নেওয়া হয়, সেখানে নানা ধরনের বিপদের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। মেয়েরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে, সমাজে নিজের যোগ্যতাবলে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে ঠিকই, তবে এখনো বিয়েকেই মেয়েদের সামাজিক পরিচয় (সোশ্যাল আইডেনটিটি) হিসেবে ধরা হয়। এ কারণেই বাসা ভাড়া নিতে গেলে তার নিজের পরিচয় ছাপিয়ে সে কেন অবিবাহিত, তা মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।  মেয়েদের এগিয়ে নিতে হলে এই শহরে মেয়েরা যেন নিরাপদ থাকে, তাও নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে যত দিন যাবে, মেয়েদের সমস্যা আরও প্রকট হয়ে উঠবে।

 অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, মেয়েদের কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, এ কারণে শহরে মেয়েদের বাড়ি ভাড়ার চাহিদা তৈরি হচ্ছে। তবে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা অনেক ক্ষেত্রেই বদলায়নি। একটা মেয়ের যত যোগ্যতাই থাকুক, অনেকেই ভাবেন, শুধু পুরুষ হওয়ার কারণে একটা মেয়েকে জীবনযাপন নিয়ে উপদেশ দেওয়ার অধিকার তাঁর আছে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 145 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ