বিদেশ থেকে আসলে ‘বোয়াল’, দেশি রুটে ‘রুই’

Print

%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6-%e0%a6%a5%e0%a7%87%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%86%e0%a6%b8%e0%a6%b2%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a7%8b%e0%a7%9f%e0%a6%be%e0%a6%b2-%e0%a6%a6বিদেশ থেকে এলে বলা হয় ‘বোয়াল মাছ’। আর দেশি রুট দিয়ে ঢুকলে তার নাম ‘রুই মাছ’। কিন্তু এর কোনোটাই আসলে মাছ নয়। এগুলো হচ্ছে স্বর্ণের বার। এভাবেই সাংকেতিক নামে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে সিলেট দিয়ে ভারতে যাচ্ছে স্বর্ণের চোরাচালান। চালান আদান-প্রদানেও রয়েছে সাংকেতিক সব শব্দ। ধরা পড়ার অবস্থা তৈরি হলে বলা হয় ‘বিপদ’ অথবা ‘আপদ’। আর ধরা পড়ার অবস্থা মোকাবিলার ক্ষেত্রে ‘ভাইজান’ ও ‘গেটিস’ শব্দের ব্যবহার হয়।
মূলত মোবাইলফোনের কথোপকথনে ব্যবহার করা হচ্ছে এসব সাংকেতিক নাম। তথ্য আদান-প্রদান আর স্বর্ণের অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে এসব সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার করা হয়। জানা যায়, সোনার চোলাচালান নির্বিঘ্ন করতেই এ কৌশল অবলম্বন করছে চোরাচালানিরা।

বুধবার (১৭ নভেম্বর) সিলেটের এম এ জি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৯ কেজি ওজনের স্বর্ণের বার ধরা পড়ার পর বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। সূত্র জানায়, সিলেটে স্বর্ণের চোরাকারবারিরা বিদেশি স্বর্ণের বারকে বোয়াল মাছ ও দেশীয় স্বর্ণের বারকে রুই মাছ নামে ডাকে।
২০১৪ সালে সিলেটে এক সৌদি প্রবাসির নিয়ে আসা স্বর্ণের বার
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কয়েকদিন আগে সিলেটের অন্তত ৩০জন স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রায় ৪০ কোটি টাকা স্বর্ণের বার কিনে রিজার্ভ রেখেছিলেন। হিলারি বিজয়ী হলে শেয়ার মার্কেটে আরও গতিশীলতা বা স্বর্ণের দামে বেশি মুনাফার আশায় তারা স্বর্ণের বারগুলো কিনে রিজার্ভ রেখেছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু ট্রাম্প বিজয়ী হওয়ার পর তাদের সে ব্যবসায় ভাটা পড়ে।
সিলেটে স্বর্ণের বারের ব্যবসার সঙ্গে নগরের আম্বরখানা সোনালী ব্যাংকের নিচে অবস্থিত মানি চেঞ্জারের একাধিক ব্যবসায়ী জড়িত বলে জানা যায়। এসব ব্যবসায়ীর পাশাপাশি স্বর্ণ চোরাচালান ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন সিলেটের অনেক পাথর ও কয়লা ব্যবসায়ীও। এ চক্রটি ভারত থেকে কয়লা আমদানি ও পাথর রফতানি করে ব্যয় বহন করে স্বর্ণের বার আদান-প্রদানের মাধ্যমে।
সিলেটের ১৫টি মানি চেঞ্জারের অনুমোদন থাকলেও রয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক অবৈধ মানি চেঞ্জার। বৈধ ও অবৈধ মানি চেঞ্জারের আড়ালে চলে সিলেটে স্বর্ণের বারের ব্যবসা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিলেটের কয়েকজন স্বর্ণ ব্যবসায়ী জানান, সিলেটের বিমানবন্দর হয়ে আগের তুলনায় এখন স্বর্ণের চোরাচালান খুব কম আসে। একমাত্র মধ্যপ্রাচ্য থেকে কয়েকজন ব্যক্তি টিকিটের খরচ তোলার জন্য প্রায়ই দুই-একটি স্বর্ণের বার নিয়ে আসেন।
তিনি আরও জানান, সিলেটে এখন স্বর্ণের চালান আসে মূলত ট্রেনে করে চট্টগ্রাম থেকে। এসব চালানের বেশির ভাগই আসে রাতে। এগুলো সিলেটের স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে সীমান্ত পথে চলে যায় ভারতে।
১৬ নভেম্বর ধরা পড়া ৯ কোজি স্বর্ণের বার
বিমানবন্দর কাস্টমস সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের ১ মে প্রায় দেড় কেজি ওজনের ১৪টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করে কাস্টমস কর্মকর্তারা। যার মূল্য প্রায় ৭৫ লাখ টাকা। এ ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হয় বিমানবন্দর থানায়। সেসময় কানাইঘাট উপজেলার গোয়াইলজুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল লতিফের পুত্র সৌদি প্রবাসী কামাল উদ্দিনের (৩৬) কাছ থেকে আটটি স্বর্ণের বার (৯৩৩ গ্রাম) এবং বিয়ানীবাজার মাথিউরা গ্রামের বাসিন্দা সাফায়েত আলীর পুত্র প্রবাসী খায়রুজ্জামানের (৫০) কাছ থেকে ছয়টি স্বর্ণের বার (৬৪১ দশমিক ৫২ গ্রাম) উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় কাস্টমস কর্মকর্তা আলী আনোয়ার বাদী হয়ে চোরাচালান আইনে খায়রুজ্জামানের বিরুদ্ধে বিমানবন্দর থানায় মামলা (নং-২) দায়ের করেন এবং কামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে কাস্টমস কর্মকর্তা জিয়াউল করিম বাদী হয়ে একই থানায় আরেকটি মামলা দায়ের করেন।
একই বছরের ৫ জুন সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে স্বর্ণের বারসহ দুজনকে আটক করে বিমানবন্দর থানা পুলিশ। আটককৃতরা হচ্ছে কানাইঘাট উপজেলার ঝিঙ্গাবাড়ি এলাকার আবু বক্কর সিদ্দিকের ছেলে মুর্শেদ আহমদ ও শহিদ আহমদ। এসময় তাদের কাছ থেকে ১শ গ্রাম ওজনের একটি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়।
এছাড়াও একই বছরের ২৩ আগস্ট সৌদি প্রবাসী জয়নাল আবেদিনের কাছ থেকে দুই কেজি ১০০ গ্রাম স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। জয়নাল সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার বীরশ্রী ইউনিয়নের ষাটশোলা গ্রামের বাসিন্দা। কার্বন পেপারে মুড়িয়ে সাবানের ভেতর ১৮টি স্বর্ণের বার লুকিয়ে এনেছিল তারা।
সর্বশেষ চলতি বছরের ১৬ নভেম্বর বুধবার সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে আবুধাবি থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট নং-(২২৮) করে ৯ কেজি ৩শ’ গ্রাম ওজনের ৮০টি স্বর্ণের বার আসে। যার মূল্য প্রায় সাড়ে ৩কোটি টাকা। স্বর্ণের বারগুলো বিমানের আসনের নিচ থেকে উদ্ধার করে শুল্ক গোয়েন্দারা।
সিলেট এম এ জি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাস্টমস কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, চোরাকারবারিরা যাতে শুল্ক গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি না দিতে পারে সেজন্য গোয়েন্দারা সবসময় সক্রিয়। এজন্য দেশ-বিদেশে সোর্সও নিয়োগ করা রয়েছে।
সিলেট মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (গণমাধ্যম) রহমতউল্লাহ জানান, ‘চোরাকারবারিরা যে সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করছে তা আমাদের জানা আছে। গোয়েন্দা পুলিশ এ বিষয়ে কাজ করছে। আর সিলেটের কিছু মানি চেঞ্জার ও স্বর্ণ ব্যবসায়ীও আমাদের নজরদারিতে আছে।’

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 122 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ