বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়াই গ্যাস লাইটার কারখানা

Print

%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ab%e0%a7%8b%e0%a6%b0%e0%a6%95-%e0%a6%85%e0%a6%a7%e0%a6%bf%e0%a6%a6%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%85%e0%a6%a8%e0%a7%81%e0%a6%aeঢাকার আশুলিয়ায় অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত কালার ম্যাক্স (বিডি) লিমিটেড নামের গ্যাস লাইটার প্রস্তুতকারী কারখানাটির জন্য বিস্ফোরক অধিদপ্তর এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের অনুমতি ছিল না। এই দুই অধিদপ্তরের দাবি, দুর্ঘটনার পর তারা কারখানাটি সম্পর্কে জেনেছে।
ওই কারখানায় গত মঙ্গলবারের অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ আরও একজন নারী শ্রমিক গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে মারা গেছেন। তাঁর নাম রকি আক্তার (১৮)। এ নিয়ে দগ্ধ ২৬ জনের দুজন মারা গেলেন। দগ্ধ বাকি ২৪ জন নারী ও শিশু শ্রমিক চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকেরা বলেছেন, দগ্ধ অন্যরাও আশঙ্কামুক্ত নন।
ওই অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় তিন দিনেও মামলা হয়নি।
এদিকে আশুলিয়ার চারাবাগের পলমল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড গ্যাস লাইটার ফ্যাক্টরিতেও গত বছর অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়েছিলেন সাত-আটজন শ্রমিক। সেখানেও অধিকাংশই শিশু শ্রমিক। অভিযোগ রয়েছে, ওই কারখানায়ও শ্রমিকদের নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।
এই দুই কারখানা সম্পর্কে জানতে চাইলে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক মো. শামসুল আলম বলেন, লাইটার তৈরির ক্ষেত্রে গ্যাসের সিলিন্ডার থেকে গ্যাস নেওয়া হয়। কারখানায় আধা লিটারের বেশি গ্যাস নিয়ে কাজ করা হলে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অনুমতি নিতে হবে। কিন্তু এই দুই প্রতিষ্ঠানের কোনোটিই অনুমতি নেয়নি।
অবশ্য পলমলের মালিক বিস্ফোরক অধিদপ্তরসহ সব দপ্তরের অনুমতি নেওয়ার দাবি করেছেন।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল) জাকির হোসেন বলেন, কালার ম্যাক্স কারখানাটির জায়গায় আগে ছিল মুরগির খামার। অনুমতির জন্য না আসায় অধিদপ্তর জানত, সেখানে মুরগির খামারই আছে। দুর্ঘটনার পর বিষয়টি তাঁরা জেনেছেন। তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এমন কাজে শিশুদের নিয়োগ করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
আশুলিয়ার জিরাব বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় ৪০০ গজ দূরে কালার ম্যাক্স (বিডি) কারখানা। যেতে হয় সরু গলি ধরে। স্থানীয় লোকজন বলেন, বছর চারেক আগে প্রায় ৪২ শতাংশ জমির ওপর কারখানাটি শুরু হয়। কারখানার জমির মালিক ঢাকা-১৯ আসনের বিএনপির সাবেক সাংসদ দেওয়ান মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনের ছোট ভাই দেওয়ান মঈনুদ্দিন। তিনিই মুরগির খামার করেছিলেন। পরে ওই জায়গা ভাড়া নিয়ে গ্যাস লাইটার কারখানা করা হয়। এই কারখানার মালিক তিনজন—শামীম এলাহী, মাহমুদ আলম ও মাহমুদ কাউসার। শামীম এলাহী ঢাকা-৭ আসনের সাংসদ ও আওয়ামী লীগ নেতা হাজি সেলিমের ভায়রা। কারখানাটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন নজরুল ইসলাম। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে মালিকদের কাউকে পাওয়া যায়নি।
গতকাল কারখানাটি ঘুরে দেখা যায়, তিনটি লম্বা আধা পাকা শেডে চলত কার্যক্রম। আগুনে সব শেডই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাঁ দিকের শেডের একটি কক্ষে ত্রুটিপূর্ণ লাইটার থেকে গ্যাস বের করা হতো। ওই কক্ষেই আগুনের সূত্রপাত হয়। গতকালও কক্ষটিতে শিশুদের পোড়া স্যান্ডেল দেখা গেছে। কক্ষটির পাশেই পড়ে ছিল চারটি অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র। এই যন্ত্রগুলোর ব্যবহার শ্রমিকেরা জানতেন না। এর ব্যবহারবিধি পাওয়া গেছে কারখানার মূল কার্যালয়ের ড্রয়ারে।
কারখানার নিরাপত্তাকর্মী মুখলেসুর রহমান বলেন, শ্রমিকেরা না জানলেও আগুন নেভানোর জন্য লোক ছিলেন। তাঁরা চেষ্টা করেছেন। আরেক নিরাপত্তাকর্মী শহিদুল ইসলাম ও একাধিক শ্রমিক বলেন, ত্রুটিপূর্ণ লাইটার থেকে সনাতন পদ্ধতিতে গ্যাস বের করার কক্ষটিই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। শ্রমিকদের এই কক্ষে আগুনের স্ফুলিঙ্গ তৈরি করতে নিষেধ করা হয়েছিল। কিন্তু দুই মাস আগে কাজে যোগ দেওয়া শিশু শ্রমিক আঁখি (১৪) মঙ্গলবার বিকেলে একটি লাইটার থেকে গ্যাস বের করার সময় অসাবধানতাবশত লাইটারের মাথায় চাপ দেয়। এতে তৈরি হওয়া স্ফুলিঙ্গ থেকে সারা কক্ষে আগুন ধরে যায়।
অগ্নিকাণ্ডে হতাহত শ্রমিকদের ঘটনায় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত মামলা না হওয়া প্রসঙ্গে আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আকবর আলী খান বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দুর্ঘটনাটি তদন্ত করছে। তদন্ত শেষে মামলা হবে।
তবে ভুক্তভোগী কয়েকজন অভিযোগ করেন, কারখানার মালিক প্রভাবশালী হওয়ায় পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করছে।
দগ্ধ শ্রমিকদের অবস্থা: কালার ম্যাক্স কারখানায় মঙ্গলবার দগ্ধ ২৬ জনের মধ্যে ২১ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে এবং ৫ জনকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
বার্ন ইউনিটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রকি আক্তার গতকাল সকালে মারা যান। শ্বাসনালিসহ তাঁর শরীরের ৭০ শতাংশ পুড়েছিল। এর আগে মঙ্গলবার গভীর রাতে মারা যায় শিশু শ্রমিক আঁখি আক্তার। বার্ন ইউনিটের পরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম বলেন, ভর্তি করা রোগীদের একজন চিকিৎসা শেষে চলে গেছে। চারজন আইসিইউতে আছে। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বাকি ১৪ জনের অবস্থা আগের মতোই।
গতকাল দগ্ধ শ্রমিকদের দেখতে হাসপাতালে যান স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক, শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু, সাংসদ হাজি সেলিম প্রমুখ। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী দোষীদের শাস্তি ও আহত শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসার আশ্বাস দেন। শ্রম প্রতিমন্ত্রী দগ্ধদের পরিবারের সদস্যদের ২০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেন এবং মৃত দুই শ্রমিকের পরিবারকে দুই লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
হাজি সেলিমের সঙ্গে আসা কারখানার মালিকপক্ষের একজন দগ্ধ শ্রমিকদের প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ হাজার টাকা এবং মৃত রকি আক্তারের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা সহায়তা দেন।
এনাম মেডিকেলে চিকিৎসাধীন শ্রমিকেরা সাহায্য পাননি বলে অভিযোগ করেছেন সেখানে চিকিৎসাধীন দগ্ধ এক নারীর স্বামী।
আরেক কারখানা: ওই কারখানার প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে চারাবাগে পলমল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড গ্যাস লাইট ফ্যাক্টরি। দুপুরে গিয়ে কারখানাটির মূল ফটকে অদক্ষ নারী শ্রমিক নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেখা যায়। কারখানার ভেতরে যাওয়ার অনুমতি পাওয়া যায়নি। দুপুরের খাবারের বিরতির সময় বাইরে আসা শ্রমিকদের কয়েকজনকে প্রশ্ন করলে তাঁরা বলেন, লাইফ জ্যাকেট ছাড়াই কাজ করেন তাঁরা। লাইটার থেকে গ্যাস বের করার কক্ষে শ্রমিকেরা মাস্ক ব্যবহার করেন না। অগ্নিনির্বাপণেও নেই পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। কারখানাটি পাঁচ বছর ধরে চলছে।
একাধিক শ্রমিক ও স্থানীয় লোকজন বলেন, লাইটার থেকে গ্যাস বের করার কক্ষে গত বছর আগুন লেগে সাত-আটজন দগ্ধ হন।
জানতে চাইলে কারখানাটির উৎপাদন ব্যবস্থাপক নাসির শিকদার কারখানার বাইরে দাঁড়িয়ে বলেন, কারখানার ২৫৫ জন শ্রমিকের ২১০ জন নারী। তাঁর দাবি, দুর্ঘটনা মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে। ব্যবস্থাগুলো দেখতে ভেতরে যেতে চাইলে তিনি মালিকের অনুমতি ছাড়া ভেতরে ঢুকতে দিতে অপারগতা জানান। লাইটার থেকে গ্যাস বের করতে মাস্ক ব্যবহার করা হয় কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, কক্ষটি উন্মুক্ত। আর এই গ্যাস ক্ষতিকারক নয়।
কিন্তু যোগাযোগ করা হলে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আমজাদুল হক বলেন, গ্যাস লাইটে সাধারণত মিথেন গ্যাস ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘদিন নাকে-মুখে এই গ্যাস ঢুকলে অনিবার্যভাবে শ্বাসকষ্ট, ব্রংকাইটিস, শ্বাসনালির সংক্রমণ ও প্রদাহ হবে।
সন্ধ্যায় চীন থেকে মুঠোফোনে ফোন করেন কারখানাটির মালিক আমিনুল হোসেন। তিনি বলেন, শুধু লাইফ জ্যাকেট ছাড়া তাঁর কারখানায় সব আছে। বিস্ফোরক অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের অনুমতি নেওয়া হয়েছে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 56 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ