‘বেতন পাওয়ার আগেই শইলডা পুড়ি গেল’

Print

%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%a4%e0%a6%a8-%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%93%e0%a7%9f%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%86%e0%a6%97%e0%a7%87%e0%a6%87-%e0%a6%b6%e0%a6%87%e0%a6%b2%e0%a6%a1%e0%a6%be-%e0%a6%aa‘ও মা, ব্যাথা করে, মরে গেলাম গো মা। পুরা শইল (শরীর) পুড়ি যাইতাছে, জ্বলে গেলো মা, আমি কি করমু… ও মা, মা-গো’ বলেই আর্ত চিৎকার করছিলেন ১৪ বছরের মুক্তি। আর মুক্তির মা বিলাপ করছিলেন, ‘কোনখানে চাকরি নিলাম, বেতন পাওয়ার আগেই শইলডা পুড়ি গেল মাইয়াডার।’ মুক্তির বিছানার পাশে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার মা। যেন তার কিছুই করার নেই।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের নিচতলায় অবস্থিত অবজারভেশন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা মেলে মুক্তির। দুই পা, দুই হাত, ডান চোখ আর কপাল পুড়ে যাওয়া মুক্তির যন্ত্রণার চিৎকারে সেখানে উপস্থিত সবার চোখই আর্দ্র হয়ে আসে।
মেয়ে মুক্তির পাশে মা
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার সাভারের আশুলিয়ায় কালার ম্যাচ বিডি লিমিটেড নামে একটি কারখানায় লাগা আগুনে দগ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ২১ জন নারী শ্রমিক ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। মুক্তি তাদেরই একজন। আর এ কারখানায় কেবল নারীরাই কাজ করতেন বলে রোগীদের স্বজনরা জানিয়েছেন।
মুক্তির মা মনোয়ারা খাতুন বলেন, ‘মেয়ে কান্দিছে, মেয়ের কান্দুন দেহা ছাড়া আর কিছুই করার নাই।’
বগুড়া জেলা থেকে আসা এই মা-মেয়ে গত অক্টোবরের ২৮ তারিখে বগুড়া জেলার জোহালি গ্রাম থেকে ঢাকার সাভারে আসেন। আড়াই হাজার টাকা নিয়ে জিরাবোতেই বাসা ভাড়া নেন দুজনে। গত ১ নভেম্বর এক আত্মীয়ের মাধ্যমে চাকরি নেন এই কারখানায়। মা মেয়ে দুই দুই কক্ষে পৃথকভাবে কাজ করতেন।

আইসিইউর সামনে অপেক্ষায় স্বজরা
দুই মেয়ে ও এক ছেলের মা মনোয়ারা বলেন, ‘স্বামী অসুস্থ, দুই পা নিয়ে কাজ করতে পারেন না। কিন্তু কিছু করিতো খাতি হবে। মেয়ে আর আমি দুইজনে পাঁচ হাজার টাকা বেতনে চাকরিতে ঢুকলাম। কাইল দুপুরের খাওয়ার পর ৪ টার দিকে আগুন লেগে যায় পাশের রুমে।’
নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার জানিয়ে মনোয়ারা খাতুন বলেন, ‘সে কী আগুন! দাউদাউ করি এক্কেরে ছাদ পর্যন্ত উঠি গেল। কিন্তু সেই রুমে একটা মাত্র ছোট্র দরজা, দুইজন মানুষ পাশাপাশি হাটতি পারে না-সেইখানে আগুন লাগার পর এক দরজা দিয়ে প্রায় ৫০ জন বাইর হইতে চেষ্টা করছে।’
এ সময় ‘আমার মাইয়াডার এখন কী অবস্থা হবি গো মা’- বলে আবার শুরু হয় মা মনোয়ারা বেগমের কান্না। মনোয়ারা বেগমের কান্না এড়াতে বাইরে বের হতেই অবজারভেশন ওয়ার্ডের সামনে দেখা মেলে মোংলা মণ্ডলের। জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল থানা থেকে ঢাকায় আসা মোংলা মণ্ডল জিরাবোতে বাসা-বাড়ির ময়লা টানার কাজ করেন। আর স্ত্রী মাহিরা কাজ করতেন এই কারখানায়। মেঝেতে বসে দুই হাত মাথায় নিয়ে মোংলা মণ্ডল শূণ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। কাছে গিয়ে কথা বলতেই বলে ওঠলেন, ‘ছোট মেয়েটা নানির কাছে থাকে। তারে কালকে কইছি, বেতন পাইয়া বাড়ি যাবো শীতের কাপড় নিয়া। মাইয়াডারে এখনও কিছু কই নাই, তারে কী কমু তাই ভাবতাছি।’

অসহায় মোংলা মণ্ডল
হাসপাতালের তালিকা থেকে জানা গেল, মোংলা মণ্ডলের স্ত্রী মাহিরার শরীরের ৪০ শতাংশ পুড়ে গেছে, রয়েছেন আইসিইউতে। আর দ্বিতীয় তলায় আইসিইউতে গিয়ে দেখা মেলে বাবর আলীর, যার দুই মেয়ে লাভলী ও ফাতেমা রয়েছেন আইসিইউতে। পেশায় পল্লী চিকিৎসক বাবর আলী বলেন, ‘সংসারে টানাটানি, তাই দুই মেয়ে সংসারের হাল ধরতে এই চাকরি করতো। এখন দুইটা মাইয়াই আইসিইউতে। জানি না, কী আছে কপালে।’
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম জানান, মুক্তির শ্বাসনালীসহ শরীরের ২০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছে। আর শ্বাসনালী যাদের পুড়ে যায় তাদেরকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সে হিসেবে এই ম্যাচ কারখানায় আহত হয়ে যারা এখানে ভর্তি হয়েছেন তাদের কাউকেই তারা আশঙ্কামুক্ত বলতে পারছেন না, কারণ এদের সবারই শ্বাসনারী পুড়ে গিয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেল, মঙ্গলবার আসা ২১ রোগীর মধ্যে ৩৫ শতাংশ পোড়া নিয়ে আসা ১৪ বছরের আঁখি মারা গিয়েছে রাতে। আর একজন রোগী প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। বাকি ১৯ জনের মধ্যে ৪ জন আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র), ৪ জন এইচডিইউ (হাইডিপেনডেন্সি ইউনিট), ৪ জন অবজারভেশন ওয়ার্ডে ও ৭জন পোস্ট অপারেটিভ বিভাগে রয়েছেন।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 54 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ