ভালো নেই গ্রামীণ ব্যাংক

Print
2012-08-30-19-52-33-503fc481d0baa-untitled-8সাড়ে পাঁচ বছরেও নিয়োগ হয়নি ব্যবস্থাপনা পরিচালক। পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ নেই প্রায় দু’বছর। কবে নাগাদ শূন্যতা পূরণ হবে তার স্পষ্ট পথনির্দেশ দেখা যাচ্ছে না। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এমন সংকটে চলছে গ্রামীণ ব্যাংক। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন বেতন কাঠামোর ব্যয় বহনের চাপ। বেড়েছে পরিচালন ব্যয়। সুদ আয় কমেছে। বেড়েছে মন্দ ঋণের পরিমাণও। ফলে ঋণ ও আমানত বাড়লেও মুনাফা হারাচ্ছে ব্যাংক। ব্যাংকটির গত কয়েক বছরের আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ড. ইউনূসের অব্যাহতির বছরে অর্থাৎ ২০১১ সালে তার আগের বছরের তুলনায় মুনাফা কমে যায়। ২০১০ সালে মুনাফা ছিল ৭৬ কোটি টাকা। পরের বছর তা কমে দাঁড়ায় ৬৮ কোটিতে। কিন্তু পরের দু’বছর বেশ মুনাফা বাড়ে। ২০১২ সালে ১৪৫ কোটি ও ২০১৩ সালে ১৩৩ কোটি টাকা মুনাফা করে ব্যাংক। কিন্তু গত দু’বছর খুব কম মুনাফা হয়েছে। ২০১৪ সালে মুনাফা হয়েছে ৪৩ কোটি টাকা। আর ২০১৫ সালে তা ব্যাপক কমে মাত্র আড়াই কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা মকালকে জানিয়েছেন, বেতন-ভাতা বাবদ পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণেই ২০১৫ সালে নিট মুনাফা অনেক কমেছে। এ ছাড়া ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতিও (প্রভিশন) মুনাফা কমার অন্যতম কারণ। ব্যাংকের ব্যালান্সশিট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৫ সালে ব্যাংকটির বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় ১৪০ কোটি টাকা বেড়েছে। ২০১৪

সালে প্রায় ২২০০ কর্মীর বেতন-ভাতা বাবদ ব্যাংক ৬১৭ কোটি ব্যয় করেছে। যা ২০১৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৭৫৭ কোটি টাকা। তবে মোট পরিচালন ব্যয় বেড়েছে ১৩১ কোটি টাকা। এর পরও ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৫২১ কোটি টাকা। কিন্তু ঋণের বিপরীতে নিরপত্তা সঞ্চিতি বাবদ ৪২ কোটি টাকা বেড়ে যাওয়ায় মোট নিরাপত্তা সঞ্চিতি দাঁড়িয়েছে ৫১৯ কোটি টাকা। গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালন মুনাফা থেকে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বাদ দিয়ে নিট মুনাফা হিসাব করে।

এদিকে ব্যাংকটির মন্দ ঋণ বেড়েছে পর্যায়ক্রমে। ২০১১ সালে ৯৮ কোটি টাকার মন্দ ঋণ এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০০ কোটিতে। ২০১২ সালে মন্দ ঋণ ছিল ১৪৭ কোটি টাকা। পরের বছর ২০১৩ সালে মন্দ ঋণ বেড়ে ৩১৮ কোটি টাকা হয়। ২০১৪ সালে তা আরও বেড়ে ৪৩৭ কোটিতে দাঁড়ায়। ২০১৫ সাল শেষে মন্দ মানের ঋণ ছিল ৪৮৭ কোটি টাকা। গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা। এ সময়ে ৫ থেকে ৯টি কিস্তি পরিশোধ করছে না এমন ঋণের পরিমাণ ১৩২ কোটি টাকা। আর মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের পরিমাণ ১০৩ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট আমানতের পরিমাণ ১৮ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা। ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে সুদ আয় কমেছে প্রায় ২৭ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে সুদ আয় হয়েছিল ১২৩৩ কোটি টাকা, যা ২০১৪ সালে নেমে আসে ১২০৫ কোটিতে। ২০১৫ সালে তা আরও কমে ১১৭৯ কোটিতে নেমেছে।

ব্যাংকটির পর্যবেক্ষণ দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী গ্রাহক ও কর্মী। এতে অনিয়ম হচ্ছে। ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৪৫১টি ঋণ অনিয়ম ধরা পড়েছে। এর সঙ্গে প্রায় ২৭ কোটি টাকা জড়িত। কর্মীদের ঋণ ও আগাম নেওয়া বেড়েছে। প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে আগাম ঋণ বেড়েছে অনেক বেশি।

২০১১ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত ব্যাংকটির ব্যাপ্তি বিশেষ বৃদ্ধি পায়নি। গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির মোট শাখা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৬৮টিতে। যা ২০১১ সালে ছিল ২ হাজার ৫৬৫টি। ২০১১ সালে ব্যাংকটিতে ২২ হাজার ১২৮ জন কর্মী থাকলেও বর্তমানে তা কমে ২১ হাজার ৮০৭ জনে দাঁড়িয়েছে। আগের তুলনায় কমেছে গ্রামীণ সেন্টার। ২০১১ সালে এক লাখ ৪৪ হাজার ৯৫টি সেন্টার ছিল সারাদেশে। বর্তমানে রয়েছে এক লাখ ৪২ হাজার ৪৭২টি। তবে গ্রাহক বেড়েছে। ২০১১ সালে ৮৩ লাখ ৭২ হাজার সদস্য এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮ লাখ ৭৬ হাজারে।

যদিও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দাবি, ২০১১ সালের মে মাসে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পর ব্যাংকটির সদস্য, আমানতকারী ও কর্মীদের মধ্যে যে আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়, তা ইতিমধ্যে কেটে গেছে। সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে। ফিরে আসছেন ব্যাংকের সদস্য নয় এমন আমানতকারী, যাদের অনেকেই ড. ইউনূসের অব্যাহতির পর আমানত তুলে নিয়েছিলেন।

ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক রতন কুমার নাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে অসুস্থতার কারণে তিনি কথা বলতে পারেননি। পরে ব্যবস্থাপনা পরিচালক সচিবালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক মোস্তফা কামাল বলেন, ব্যাংকের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো অসুবিধা নেই। কার্যক্রম গতিশীল করতে সম্প্রতি অনেকগুলো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন সদস্য সংগ্রহে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গৃহঋণসহ কিছু ঋণের সীমা সম্প্রতি বাড়ানো হয়েছে।

পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ নেই : প্রায় দুই বছর পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ ছাড়াই চলছে ব্যাংকটি। ২০১৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে সদস্যদের নির্বাচিত ৯ প্রতিনিধির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এর পরে আর ওই ৯ জনকে নির্বাচিত করা হয়নি। সেই থেকে সরকারের নিয়োগ করা তিন পরিচালক ও ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন। এর মধ্যে ২০১১ সালে সরকারের নিয়োগকৃত চেয়ারম্যান খোন্দকার মোজ্জাম্মেল হক ২০১৩ সালে অর্থমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। যদিও সরকার তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেনি। চেয়ারম্যান খোন্দকার মোজ্জাম্মেল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। পর্ষদ গঠন বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কারোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ গঠনের বিষয়টি সরকারের শীর্ষ মহলের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

২০১৩ সালের নভেম্বরে গ্রামীণ ব্যাংক আইন পাস হয়। আইনের ৯ ধারায় বলা হয়েছে, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ১২ জন সদস্য থাকবেন। এর মধ্যে তিনজন সদস্য নিয়োগ করবে সরকার। বাকি ৯ সদস্য ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডাদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন। এ ছাড়া ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকও পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, তবে তার ভোটাধিকার নেই। পর্ষদের পরিচালক নির্বাচন হবে তিন সদস্যের একটি কমিশনের অধীনে। ওই কমিশন এখনও গঠন করতে পারেনি সরকার। প্রথমে বলা হয়েছিল আইন পাসের ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। কিন্তু কমিশন গঠন না হওয়ায় এই ধারা সংশোধন করে বলা হয়েছে, কমিশন গঠনের ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন হবে। কমিশন কবে গঠন হবে তা বলা হয়নি।

ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিয়ে চলছে সাড়ে ৫ বছর :প্রতিষ্ঠার পর থেকে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন ড. মুহাম্মাদ ইউনূস। টানা ২৭ বছর দায়িত্ব পালনের পর ৬০ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ায় ২০১১ সালের ১১ মে দায়িত্ব থেকে সরে যেতে হয় প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালককে। তারপর ওই পদে স্থায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেয়নি সরকার। ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব দিয়ে চালানো হচ্ছে। আবার কবে নাগাদ এ প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসবেন, তার নিশ্চয়তা নেই। ড. ইউনূসের পর ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নূরজাহান বেগমকে ২০১১ সালের ১২ মে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক করা হয়। ওই বছরের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাকালীন এই কর্মী অবসরে গেলে আরেক কর্মী এম শাহজাহানকে ওই দিন (১৪ আগস্ট) থেকে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব দেয় পরিচালনা পর্ষদ। তিনি দায়িত্ব পালন করেন ২০১৪ সালের ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত। এরপর এ এস এম মহিউদ্দিনকে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক করা হয়। তিনি এক বছর দায়িত্ব পালন করে পরের বছর ২০১৫ সালের অক্টোবরে অবসরে যান। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে আছেন ব্যাংকের আরেক কর্মী উপব্যবস্থাপনা পরিচালক রতন কুমার নাগ।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 67 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ