‘মাদকের হাট’ পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত

Print

%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%9f-%e0%a6%aa%e0%a6%a4%e0%a7%87%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%81‘লাগবে… হুইস্কি, ব্রান্ডি, বিয়ার? ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইনও আছে। কী দিব বলেন।’ উত্তরে কিছুই বলছেন না পারভেজ। বিক্রেতা নাছোড়বান্দা, ‘চলেন, দোকান আছে আমাদের। খেয়ে শুয়ে থাকবেন।’ একপর্যায়ে ‘পরে’ বলে কোনো রকমে পাশ কাটিয়ে বাঁচেন পারভেজ। পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে শুক্রবার সন্ধ্যায় এই পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন পারভেজ নামের ওই যুবক। এখানে মাদক হয়রানি এখন আর লুকোছাপা কিছু নয়। পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত যেন মাদকের হাট। রাত-দিন সমানে নানা ধরনের মাদক বিক্রি হয় এই সৈকতে। পারভেজের সঙ্গে কথা হয় এই যুবকের। তিনি বলেন, ‘পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে এলেই মাদক বিক্রেতাদের খপ্পরে পড়তে হয়। মাস চারেক আগেও এখানে এসেছিলাম। তখনো বিক্রেতারা একইভাবে মাদক কেনার জন্য জোরাজুরি করেছিল। এসব যে আমি খাই না, তা বলার সুযোগ পর্যন্ত দেয় না তারা।’ স্থানীয় লোকজন জানান, দক্ষিণ পতেঙ্গা এলাকার ১৭ নম্বর চাইনিজ ঘাট ও বিনোদন ¯পট সি বিচে অবাধে বেচাকেনা চলে মাদকদ্রব্য। এখানে বিক্রির তালিকায় শীর্ষে থাকা মদের মধ্যে রয়েছে নন্দ ভদকা, দয়াবলু বিয়ার, হিরু হুইস্কি, বাবারিয়া বন্ড বিয়ার, হাই ক্লাস হুইস্কি, মর্দালী রান-৬৮০ এমএল, আন্দামান গোল্ড, মিয়ানমার রাম, লন্ডন রাম, কান্ট্রিও ¯পেশাল ৭৫সিএল ড্রাই জিন ইত্যাদি। এ ছাড়া ইয়াবা, হেরোইনসহ অন্যান্য মাদক বিক্রি তো আছেই। সন্ধ্যার পর এখানে বসে মাদকের আসর। তরুণ-যুবকরা প্রকাশ্যে মাদক সেবন করে। তাদের মাতলামিতে বিড়ম্বনা ও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন নগরীর দূর-দূরান্ত থেকে আসা বিনোদনপিয়াসী মানুষ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কর্ণফুলী নদী হয়ে এই সৈকতে অবাধে ঢুকছে মাদকের চালান। মদ, বিয়ার, ফেনসিডিল, হেরোইন থেকে শুরু করে ইয়াবার চালান আসছে পতেঙ্গায়। এখান থেকে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার মাদক যাচ্ছে চট্টগ্রাম ও দেশের বিভিন্ন স্থানে। কোস্টগার্ড গত অক্টোবর ও নভেম্বর মাসের শুরুর দিকে পতেঙ্গা এলাকা থেকে ইয়াবার তিনটি বড় চালান আটক করে, যার মূল্য ৩০ কোটি টাকার বেশি। এ সময় একটি চালানের সঙ্গে তিন পাচারকারীকেও আটক করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, পতেঙ্গা থানার পুলিশের নাকের ডগাতেই এসব ঘটছে। এমনকি থানা-পুলিশের সহযোগিতায় পতেঙ্গা এলাকায় অবাধে মাদক ঢুকছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। তারা বলছে, চোরাকারবারিদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নেয় পুলিশ। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর হোসেন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, সিএমপির ১৬ থানার মধ্যে একমাত্র পতেঙ্গা থানা এলাকায় মাদক বেচাকেনা হয় না। একসময় সিমেন্ট ক্রসিং এলাকায় মাদক বেচাকেনা হলেও বর্তমানে তা ইপিজেড থানা এলাকায় চলে গেছে। কিন্তু চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার নুর-এ-আলম মিনা বলেছেন, মাদকের মধ্যে এখন সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ ইয়াবা। চট্টগ্রামের বিভিন্ন সড়কে পাচারের সময় পুলিশ, র‌্যাবের বাধা ও পাহারার সম্মুখীন হয়ে চোরচালানিরা নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে বেছে নিয়েছে সাগরপথে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতকে। পুলিশ সুপার বলেন, শুধু ইয়াবা নয়, দেশি-বিদেশি সব ধরনের মাদকদ্রব্যের হাটে পরিণত হয়েছে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদক পাচার হচ্ছে এই সৈকত থেকে। এ নিয়ে চট্টগ্রামের পুলিশ প্রশাসন উদ্বিগ্ন বলে জানান তিনি। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার ও ভারত ছাড়াও থাইল্যান্ড থেকে আসা মাদকের চালান তিনটি জোন দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এ তিন জোন হলো- বঙ্গোপসাগরের মহেশখালী, টেকনাফ ও আনোয়ারার শাহপরীর দ্বীপ। ওই সব জোন থেকে জাহাজ বা ছোট ছোট ট্রলারের সাহায্যে ভাটিয়ারী থেকে আনোয়ারা গহিরা পর্যন্ত সমুদ্রপথের বিভিন্ন জোনে খালাস করা হয়। এখান থেকে চোরাকারবারিরা পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে প্রবেশ করে নগরীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করে। সাম্প্রতিক সময়ে এ রকম একাধিক ইয়াবার চালান কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর অভিযানেও ধরা পড়ে। পাচারকারীদের দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে কোস্টগার্ড পূর্ব জোনের জোনাল কমান্ডার সাইদুল ইসলাম বলেন, দক্ষিণ পতেঙ্গা এলাকার জাকির হোসেন, ইউসুফ, বখতিয়ার, উসমানসহ কয়েকজন চোরাকারবারি এই মাদক পাচার কাজে জড়িত। পতেঙ্গা, কর্ণফুলী ও বন্দর থানায় তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে তাদের নাম উল্লেখ রয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জোনের (বন্দর) পরিদর্শক তপন কান্তি শর্মা জানান, পতেঙ্গা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদকের ব্যবসা চললেও প্রশাসন তাদের দমন করতে পারছে না। অথচ এ পতেঙ্গা এলাকায় রয়েছে পতেঙ্গা থানা, রয়েছে র‌্যাব-৭ এর সদর দপ্তর। কর্ণফুলী নদীতে কোস্টগার্ডের নিয়মিত তৎপরতাও রয়েছে। মাঝে মধ্যে র‌্যাব পরিত্যক্ত অবস্থায় মাদক উদ্ধার করলেও চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 212 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ