মোবাইল কোম্পানির হাজারো প্যাকেজ , মেসেজে বিভ্রান্ত গ্রাহক

Print

প্যাকেজ আর মেসেজের কোনো নিয়মনীতি নেই

1435390448
রাজধানীতে একটি জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিক সাখাওয়াত কাওসার। গত ২০ অক্টোবর দুপুর একটা ৪০ মিনিটে তিনি নিজের বাংলালিংক নম্বরে ৫৮ টাকা রিচার্জ করেন। এরপর তিনি তিনটি ফোন করে ৫ থেকে ৬ মিনিট কথা বলেন। চতুর্থ ফোনটি করতে গিয়েই তিনি দেখেন কোনো ব্যালান্স নেই। দ্রুত আরও কিছু ফোন করার তাড়া থাকায় ২টা ১৪ মিনিটে তিনি আরো ৫০ টাকা রিচার্জ করেন। এবার একটি কলও না করে দেখেন কোনো ব্যালান্স নেই। ফলে বাধ্য হয়েই তিনি অপর একটি সিম দিয়ে কথা বলেন। বিষয়টি জানানোর জন্য তিনি বাংলালিংকের কাস্টমার সার্ভিসে ফোন দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি। এমনকি একজন কর্মকর্তাকে ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি।

 

শুধু সাখাওয়াত কাওসার নয়, এমন অসংখ্য মানুষের অভিযোগ মোবাইল ফোন অপারেটরদের বিরুদ্ধে। কার মোবাইল থেকে কখন কত টাকা কাটা যাচ্ছে কেউ বুঝতেই পারছেন না। পাশাপাশি তাদের কত ধরনের যে প্যাকেজ তার কোনোা ইয়ত্তা নেই। প্রতিদিন মোবাইল ফোনে মেসেজ দিয়ে গ্রাহকদের এই প্যাকেজের কথা জানায় অপারেটররা। দিনে অন্তত ২০ থেকে ৩০টি ম্যাসেজ যায় প্রতিটি মোবাইল ফোনে। তার প্রতিটিতেই কোনো না কোনো অফারের কথা বলা হচ্ছে। এত প্যাকেজ আর মেসেজের ফাঁদে পড়ে বিভ্রান্ত হচ্ছেন গ্রাহক। অধিকাংশ গ্রাহক নিজেই জানেন না তিনি কোনো প্যাকেজে আছেন। সেই প্যাকেজে কল করা বা ইন্টারনেটের রেটই বা কি।

 

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ  বলেন, ‘গ্রাহকদের এসব অভিযোগ  নিয়ে আমরাও উদ্বিগ্ন। এ কারণেই আমরা সাধারণ মানুষের অভিযোগ নিয়ে গণশুনানির আয়োজন করেছি। আগামী ২২ নভেম্বর এই গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে। ওই দিন সাধারণ গ্রাহকদের অভিযোগের কথা সরাসরি জানানোর জন্য বিটিআরসি আসার অনুরোধ করছি আমি। গণশুনানিতে যেসব অভিযোগ উঠে আসবে সেগুলো নিয়ে আমরা তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেব। গ্রাহকের স্বার্থই আমাদের কাছে বড়।’

 

টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের ফেসবুক পেজে একটি স্টাটাসের নীচে আলমগীর জাহান অনিক নামে একজন গ্রাহক লিখেছেন, ‘আপা আপনাকে একটা কথা বলার ছিল। আমি এয়ারটেলের গ্রাহক। যদি সিমের টাকা শেষ হয়ে যায়, আর যদি ইমারজেন্সি ব্যালেন্স নেই ১০ টাকা, তাহলে ওরা কেটে নেয় ১২ টাকা। আর যদি ইমারজেন্সি ব্যালেন্স নিয়ে কয়েক দিন টাকা ঢোকাতে না পারি তাহলে সেটা দিন দিন বাড়তে থাকে। ১০ টাকা থেকে বেড়ে ৭ দিন পর হয়ে যায় ১৫ টাকা। আপা আপনি দয়া করে এটা বন্ধ করার জন্য এয়ারটেলকে বলবেন।’

 

প্রতিমন্ত্রীর ফেসবুক পেইজে তার বিভিন্ন স্টাটাসের নীচে এমন অসংখ্য মন্তব্য মোবাইল ফোনের সাধারণ গ্রাহকদের। নানাভাবে মানুষ প্রতিমন্ত্রীসহ এই সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকষণের চেষ্টা করেন। আর বিটিআরসিতে অভিযোগ করার যে ব্যবস্থা আছে সেটা সাধারণ মানুষের জন্য খুব একটা সহজও নয়। তাছাড়া অধিকাংশ মানুষ এসব অভিযোগ কিভাবে করতে হয় তা জানেও না। আবার ৫০/১০০ টাকার জন্য অনেকে এসব জটিলতা এড়িয়ে যান।

 

সর্বশেষ গত ১৭ অক্টোবর টাঙ্গাইল ক্যাডেট একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আবু সাঈদ বিপ্লব তার মোবাইল ফোনের বিলের অসংলগ্নতা নিয়ে টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।  সেখানে তিনি দেখিয়েছেন, তার পোস্টপেইড এয়ারটেল নম্বরে তিন দিনে ৩৮২ টাকাও বিল উঠেছে। এর আগেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। তিনি এই ধরনের ভৌতিক বিল থেকে পরিত্রাণ চান।

 

বিটিআরসিতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রামীণফোনের শুধু ইন্টারনেটেরই প্যাকেজ আছে দু’শ’র উপরে। রবির আছে ১৬৯টি। বাংলালিংক, এয়ারটেলেরও সংখ্যা কাছাকাছি। আর ভয়েস কলের প্যাকেজ তো আরো বেশি।

 

এ খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটা দেশে ইন্টারনেটের এত প্যাকেজ কিভাবে থাকতে পারে? এটা আসলে গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করার জন্যই। জানা গেছে, আগে অপারেটরদের প্যাকেজগুলোর অনুমোদন দিত বিটিআরসি। ২০১০ সালে আইন সংশোধন করে সেই ক্ষমতা দেওয়া হয় মন্ত্রণালয়কে। পরে আলোচনা সাপেক্ষে চলমান প্যাকেজের কিছু সংশোধন দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয় বিটিআরসিকে। আর এখন মোবাইল অপারেটররা নতুন কোনো প্যাকেজের অনুমোদনই নেয় না। তারা পুরনো একটা প্যাকেজ ভেঙে ৮/১০টা প্যাকেজ বানিয়েছে। এটা অনুমোদনের জন্য বিটিআরসির কাছে এখন পাঠানোই হয় না। নিজেরাই এসব করছে। যার ফলে শত শত প্যাকেজ হচ্ছে। বিভ্রান্তির বেড়াজালে পড়ে স্বেচ্ছায়-অনিচ্ছায় টাকা চলে যাচ্ছে সাধারণ গ্রাহকের।

 

প্রযুক্তিবিদ মোস্তফা জব্বার কয়েকদিন আগে বলেছেন, ‘প্যাকেজের নামে যা হচ্ছে সেটা রীতিমতো মহা অন্যায়। কারণ আমার প্যাকেজ কখন শেষ হচ্ছে আমি জানি না। এরপর কিলোবাইট হিসেবে টাকা কাটতে শুরু করে। কিছুদিন পর দেখা যায় যত টাকাই থাকুক ব্যালান্স শূন্য। এই ধরনের অনাচার পৃথিবীর কোনো দেশে হয় না। আর এখানে অনাচার হলে অভিযোগ করারও জায়গা নেই।’ একই সময়ে তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ জাকারিয়া স্বপন  বলেছিলেন, ‘হাজার রকমের প্যাকেজের নামে জোচ্চুরি করে টাকা নেওয়া হচ্ছে। এত প্যাকেজ দেওয়া হয় শুধুমাত্র মানুষকে বোকা বানাতে। সারা বিশ্বে এটাই স্বীকৃত। এসব বিষয়ে অভিযোগ করে কোনো লাভ নেই। আমরা এখন জিম্মি। এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া দরকার।’
সুত্রঃ ইত্তেফাক

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 76 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ