রক্তের বাঁধনে…

Print

শিক্ষার্থীদের গড়া রক্তদাতাদের সংগঠন ‘বাঁধন’। দেশের মানুষকে রক্তদানে উৎসাহিত করতে কাজ করছেন সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা সংগঠনটির লক্ষাধিক কর্মী। বাঁধনের সঙ্গে কীভাবে বাঁধনে জড়িয়ে গেছেন, সে অভিজ্ঞতাই লিখেছেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এ আর মো. ফয়সাল

বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে বাঁধনের কার্যক্রম। ছবি: সংগৃহীত

২০১১ সালের শুরুর কথা। ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পেরিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুটেক্স)। নতুন পরিবেশ, আবাসিক ছাত্র হিসেবে শহীদ আজিজ হলের গণরুমে ঠাঁই হলো। অন্য কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এখানেও আছে ডজন খানেক সংগঠন। আমি যোগ দিলাম স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বাঁধনে। রক্ত দিয়ে যদি কারও জীবন বাঁচাতে পারি—সেই আনন্দটা আমি হাতছাড়া করতে চাইনি।বাঁধনের উদ্যোগে বিনামূলে্য ক্যাম্পাসেই চলছে রক্তপরীক্ষা
এভাবে বাঁধন, বুটেক্স ইউনিটের কার্যকরী সদস্য থেকে জায়গা পেলাম সিটি জোনের ইউনিট প্রতিনিধি হিসেবে। কখন যে সংগঠনের কাজটা নেশায় পরিণত হয়েছিল, টের পাইনি। এক সময় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কমিটিতে জায়গা পেলাম। তবে কাগজে-কলমে থাকা এই পদ নিয়ে আমি কখনোই ভাবতাম না; বরং বাঁধনের কর্মী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতেই ভালো লাগত।
সংগঠনের সুবাদেই মানুষের সঙ্গে মেলামেশার দক্ষতা অর্জন করেছি কি না জানি না। তবে এটুকু জানি, বাঁধন থেকে যা পেয়েছি, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা টাকাপয়সা দিয়ে তা পাওয়া যায় না। কাজের মধ্য দিয়ে বাঁধনের কর্মীদের মধ্যে যে নেতৃত্বগুণ তৈরি হয়, আজীবন তা কাজে আসে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ্ হল থেকে ১৯৯৭ সালে এই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়েছিল। বর্তমানে বাঁধন কেন্দ্রীয় পরিষদে প্রায় ৪৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাতটি জোন, স্বতন্ত্র ইউনিটসহ মোট ১১২টি ইউনিট আছে। বাঁধনের নীতিমালায় প্রতিটি কমিটিতে ১৭ জন সদস্য থাকেন। সেই হিসেবে বর্তমানে কমিটির সদস্যসংখ্যা দুই হাজারের বেশি। সারা দেশে ছড়িয়ে আছেন লক্ষাধিক কর্মী। রক্তদানসহ শীতবস্ত্র বিতরণ, দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি নানা সামাজিক কার্যক্রমের সঙ্গে বাঁধন জড়িত।
সংগঠনের সঙ্গে আমার শুরুর গল্পটা বলি। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। খবর পেলাম এক রোগীর জন্য বি পজিটিভ রক্ত লাগবে। এই রক্তের গ্রুপ সম্পর্কে আমাদের অনেকের একটা ভুল ধারণা আছে। আমরা ভাবি, বি পজিটিভ রক্ত পাওয়া খুব সহজ। কিন্তু মুশকিল হলো, এর চাহিদাও অনেক। তো যা হোক, রক্ত দিতে গিয়েছিলাম মিরপুরে। গিয়ে দেখি ছোট্ট একটা বাচ্চা, তার কিডনির সমস্যা। কেন যেন চোখে পানি এসে গিয়েছিল। সেদিন রক্ত দেওয়ার পর বাচ্চাটার বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, ‘বেঁচে থাকো বাবা। এভাবেই মানুষের সেবা করে যাও।’
সেদিন যে ভালোবাসা পেয়েছি, সেই ভালোবাসার লোভেই আজও বাঁধনের সঙ্গে বাঁধনে জড়িয়ে আছি। আমি নিশ্চিত, বাঁধনের প্রত্যেক কর্মীর ঝুলিতেই এমন অসংখ্য গল্প জমা আছে। নিজেকে বাঁধনের কর্মী বলে পরিচয় দিতে তাই গর্ব বোধ করি। এই সংগঠনের কর্মীরা স্বপ্ন দেখেন, একদিন রক্তের অভাবে বাংলাদেশে আর একজন রোগীও মারা যাবে না। বাংলাদেশে প্রত্যেক মানুষ হবেন একেকটা বাঁধন। ‘রক্ত দিলে হয় না ক্ষতি, রক্ত দেব ৪ মাস প্রতি’ স্লোগান যেন দেশের প্রত্যেক মানুষ হৃদয়ে ধারণ করেন। কেননা আমরা বিশ্বাস করি, প্রত্যেক রক্তদাতা দেশ ও জাতির কাছে একেকজন ‘সুপারহিরো’! আমরা বলি, ‘রক্ত দিয়ে পেয়েছি স্বাধীনতা, রক্ত দিয়ে বাঁচাব মানবতা।’ তাই তো বাঁধনের স্লোগান—একের রক্ত অন্যের জীবন, রক্তই হোক আত্মার বাঁধন।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 48 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ