রিটেইল ও হসপিটাল ফার্মেসী : পরবর্তী প্রজন্মের ফার্মাসিস্টদের পছন্দের কর্মক্ষেত্র ( র্পব – ৩ )

Print

রিটেইল ও হসপিটাল ফার্মেসী : পরবর্তী প্রজন্মের ফার্মাসিস্টদের পছন্দের কর্মক্ষেত্র
[Retail and Hospital Pharmacy : The choice of the next generation Pharmacists]

pharma621

আমাদের দেশে ওষুধের দোকান কিভাবে পরিচালিত হবে তার সুনির্দিষ্ট কোন সিলেবাস নাই। ইন্ডিয়ার ডিপ্লোমা ফার্মেসী ও আমাদের দেশের ’সি গ্রেড’ ফার্মেসীর সিলেবাসের আলোকে রিটেইল ফার্মেসীর উপর ধারাবাহিক আলোচনা শুরু করছি।

র্পব – ৩

(ক) ওষুধের দোকান ব্যবস্থাপনা (Management of Drug Store / Medicine Shop / Retail pharmacy)

রিটেইল ফার্মেসী বা ওষুধের দোকান বলতে কি বুঝায় ?
বাংলাদেশে সত্যিকারের কোন কমিউনিটি ফার্মেসী নেই। কমিউনিটি ফার্মেসী প্রতিষ্ঠা ও সেবা দানের যে সকল শর্ত আছে বাংলাদেশে তার বেশির ভাগই পূরণ করা হয় না। তাই রিটেইল ফার্মেসী বা খুচরা ওষুধের দোকানই একমাত্র ভরসা।
আমাদের স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও ওষুধ ব্যবস্থাপনায় সমাজের সব সদস্যের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সমন্বিত ফার্মেসী ব্যবস্থাপনার ((Integrated Pharmacy Management) মাধ্যমে যে ওষুধীয় সেবা (Pharmacy Service) পরিবেশন করে থাকে তাকে রিটেইল ফার্মেসী বলে। আমাদের দেশে Drug Store / Medicine Shop এর মাধ্যমে রিটেইল ফার্মেসী ব্যবস্থা কাজ করে থাকে।

এই সমন্বিত ব্যবস্থাটি হলো সমাজের সকল ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক কল্যানের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ, বিতরণ ও ওষুধ সম্পর্কিত সকল তথ্য প্রদান করা । সহজভাবে বলা যেতে পারে, একটি নির্দিষ্ট এলাকায় যেখান থেকে ওষুধ ও ওষুধ সম্পর্কিত তথ্য অতি সহজে পাওয়া যায় তাকে রিটেইল ফার্মেসী বলে।

আর Drug Store / Medicine Shop অর্থাৎ ওষুধের দোকানই হলো এই বহুল কথিত রিটেইল ফার্মেসী। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে,  Retail Pharmacy বা যেটাকে আমরা Medicine Shop বা Drug Store বলি, তাহা শুধুমাত্র একটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানই (trade center) নহে, এটি একটি সেবাদান কেন্দ্রও (Service giving point) বটে।

আমরা দেখি যে, রিটেইল ফার্মেসী ব্যক্তি মালিকানায় পরিচালিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠান কোন নির্দিষ্ট এলাকার প্রয়োজনীয় সকল ওষুধের চাহিদা পূরণ করে থাকে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে একদিন সঠিকভাবে রিটেইল ফার্মেসী সেবা চালু হবে সেটা আমরা আশা করতে পারি। তবে বর্তমানে বাংলাদেশে ’চেইন ফার্মেসীরও প্রচলন হচ্ছে। চেইন ফার্মেসী মূলত রিটেইল ফার্মেসী যাহা একক ও কেন্দ্রীয় তত্ত্বাবধানে অনেকগুলো ফার্মেসীর ব্যবস্থাপনা একক নামে বিভিন্ন স্থানে পরিচালিত হয়। যথা- লাজ ফার্মা, কিউ.পি.এস. ইত্যাদি।

রিটেইল ফার্মেসী বা ওষুধের দোকান এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

সমাজে রিটেইল ফার্মেসী প্রতিষ্ঠার চারটি উদ্দেশ্য থাকে। যথা –
১। কোন নির্দিষ্ট এলাকার  সকল ব্যক্তি ও পরিবারের স্বাস্থ্য ও রোগের প্রতি দৃষ্টি রেখে উপশম, প্রতিষেধক, স্বাস্থ্য সংরক্ষণ এবং রোগীর স্বাস্থ্য পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য ফার্মেসী সেবার ব্যবস্থা করা।
২। সেই এলাকার সকল স্বাস্থ্যবান ও অসুস্থ জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় ফার্মেসী সেবার (চযধৎসধপু ঝবৎারপব) ব্যবস্থা করা।
৩। সেই এলাকার সকল ব্যক্তির স্বাস্থ্য সমস্যা ও চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রেখে ফার্মেসী সেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
৪। ফার্মেসী সেবার সুযোগসমূহ সেই এলাকার অন্যান্য ডিসিপ্লিনের ব্যক্তিবর্গ (যেমন – চিকিৎসক, নার্স, রোগী বা রোগীর সেবা প্রদানকারী ব্যক্তি, স্বাস্থ্য কর্মী, এনজিও কর্মী, শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ, সমাজসেবক, কৃষিবিদ, মনোবিজ্ঞানী প্রভৃতি) যারা জনসাধারণের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নের কাজ করছেন বা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত, তাদেরকে প্রয়োজনীয় সাহায্য ও তথ্য সরবরাহ করা।

রিটেইল ফার্মেসী প্রতিষ্ঠা পদ্ধতি
রিটেইল ফার্মেসীর ব্যবসা একজন রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্টের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হওয় উচিত। রিটেইল ফার্মেসী ব্যবসা শুরু করার জন্য বৈধ ড্রাগ-লাইসেন্স থাকতে হয়। ড্রাগ লাইসেন্স ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অফিস হতে ইস্যু করা হয়ে থাকে। ড্রাগ লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে আটটি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বা ডকুমেন্ট জমা দিতে হয়। এগুলো হলো –

১। ট্রেড লাইসেন্স।
২। ব্যাংক সচ্ছলতা সনদপত্র।
৩। দোকান ভাড়ার রসিদ/চুক্তিনামা/নিজস্ব দোকানের ক্ষেত্রে মালিকানা দলিলের সত্যায়িত ফটোকপি।
৪। ফার্মাসিস্টের রেজিস্ট্রেশন সনদপত্রের সত্যায়িত কপি।
৫। নাগরিকত্ব বা ভোটার আই.ডি. কার্ডের সত্যায়িত কপি।
৬। ফার্মাসিস্টের অঙ্গীকারপত্রের মূল কপি।
৭। পূরণ করা ফরম- ৭।
৮। ট্রেজারী চালানের মূল কপি।

ট্রেজারী চালান তৈরিতে পৌর এলাকার জন্য এক হাজার পাঁচশত (১,৫০০) টাকা এবং পৌর এলাকার বাইরে সাতশত পঞ্চাশ (৭৫০) টাকার চালান করতে হয়। এ ট্রেজারী চালান শুধুমাত্র বাংলাদেশ ব্যাংক বা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক অনুমোদিত কোন ব্যাংকে জমা দিতে হয়। এই টাকা জমা দেওয়ার কোড নম্বর হলো-

1 2 7 1 5 0 0 0 0 0 8 6 3

২০১০ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত সমগ্র বাংলাদেশে ড্রাগ লাইসেন্স প্রাপ্ত বৈধ ফার্মেসীর সংখ্যা আনুমানিক ৮৭,০০০। ২০১০ সন নাগাদ বাংলাদেশের ওষুধের বাজারের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭,০০০ কোটি টাকা। এই পরিমাণের ওষুধের শতকরা ৮০-৮৫ ভাগ (আনুমানিক) খুচরা বা ব্যক্তি মালিকানাধীন ফার্মেসী ও বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিষ্ঠিত ফার্মেসীর মাধ্যমে জনসাধারণের নিকট বিক্রয় বা বিতরণ করা হয়। বাদবাকি ওষুধ বিদেশে রপ্তানি করা হয়।
একটি নতুন রিটেইল ফার্মেসী প্রতিষ্ঠা করার পূর্বে সেই এলাকায় ফার্মেসী চালু থাকার মত সামাজিক চাহিদার মৌলিক বিশ্লেষণ করতে হয়। এ বিশ্লেষণের দুটি দিক রয়েছে। একটি হল পরিমাণভিত্তিক এবং অন্যটি হল গুণগত মানভিত্তিক। মৌলিক বিশ্লেষণে যদি প্রতীয়মান হয় সে ঐ এলাকায় একটি নতুন রিটেইল ফার্মেসীর চাহিদা রয়েছে তবেই তা প্রতিষ্ঠার জন্য অগ্রসর হওয়া উচিত, নতুবা নয়।

এরপর নিম্নোক্ত তিনটি বিষয় নিধার্রণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হয় –

১। রিটেইল ফার্মেসীর মালিকানার ধরণ নিধার্রণ করা,
২। রিটেইল ফার্মেসীর জন্য স্থান নির্ধারণ করা, এবং
৩। রিটেইল ফার্মেসী গড়ার জন্য অর্থের পরিমাণ ও উৎস নির্ধারণ করা
মালিকানা বা সংগঠনের ধরণ

রিটেইল ফার্মেসী তিন ধরণের মালিকানা বা সংগঠনের যে কোন একটি হিসেবে গড়া যায়। যেমন-

১। একক মালিকানা
২। যৌথ মালিকানা
৩। কর্পোরেশন
আমাদের দেশের অধিকাংশ ফার্মেসীই একক মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত। কিছু যৌথ মালিকানার ফার্মেসীও রয়েছে, তবে সরকারি সহায়তা নিয়ে কর্পোরেশনভিত্তিক কোন ফার্মেসী বাংলাদেশে এখনও প্রতিষ্ঠিত হয় নাই।

স্থান নির্বাচন
নতুন রিটেইল ফার্মেসী প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে সিদ্ধান্ত নিতে হয় তা হল স্থান নির্ধারণ করা। স্থান নির্ধারণের জন্য প্রধানত ৪টি বিষয়ে মূল্যায়ন করতে হয়। এগুলো হলো –

১। সেই এলাকার জনসংখ্যা
২। জনসাধারণের আয়ের পরিমাণ
৩। শ্রমশিল্পের ধরণ
৪। প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা

তাছাড়া কোন ফার্মাসিস্ট কোন নির্দিষ্ট স্থানে ফার্মেসী স্থাপন করতে চাইলে তার কিছু ব্যক্তিগত কারণ জড়িত থাকতে পারে। যেমন-

১ । পারিবারিক বন্ধন
২। ব্যবসায়িক পরিবেশ
৩। সামাজিক আনুগত্য

রিটেইল ফার্মেসী প্রতিষ্ঠার জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করার পূর্বে কিছু বিষয়ে অতি সতর্ক বিবেচনা প্রয়োজন। কারণ ব্যবসায়িক সফলতা প্রতিষ্ঠানটির অবস্থানের উপর বেশ কিছুটা নির্ভরশীল। এগুলোর মধ্যে প্রথমত, রিটেইল ফার্মেসী প্রতিষ্ঠার স্থানটি জনবসতির মধ্যস্থানে হওয়া বাঞ্ছনিয়, যাতে ওষুধের চাহিদা সকলের জন্য সহজগম্য ও নিরাপদ হয়। তৃতীয়ত, পরিবহনের মাধ্যমে যাতে সেই স্থানে সহজে উঠা নামা করা যায়। চতুর্থত, ওষুধ ও ফার্মেসী সেবা যেন প্রয়োজনীয় গুণগত মানের হয় ও সুলভ মূল্যে সর্বদা পাওয়া যায়।
মূলধন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা
রিটেইল ফার্মেসীর মূলধন তিন ধরনের হয়। যেমন-
১। নগদ অর্থ
২। তালিকাভিত্তিক ওষুধ ও স্বাস্থ্য সামগ্রীর পরিমাণ
৩। আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি

আমাদের দেশে বর্তমানে একটি মাঝারি মাপের নতুন রিটেইল ফার্মেসী স্থাপনের জন্য নিচে উল্লেখিত পরিমাণের মূলধন প্রয়োজন –

১। নগদ অর্থ = ১,০০,০০০/- (এক লক্ষ টাকা)
২। ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী = ৫,০০,০০০/- (পাঁচ লক্ষ টাকা)
৩। আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি = ২,০০,০০০/- (এক লক্ষ টাকা)
সর্বমোট মূলধন = ৮,০০,০০০/- (আট লক্ষ টাকা)।

নগদ টাকা থেকে রিটেইল ফার্মেসী প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক খরচ (যেমন, দোকান ভাড়া, লাইসেন্স ফি ও আনুষঙ্গিক খরচ, প্রচারণা বাবদ খরচের অর্থ, প্রথম তিন মাসের জন্য বিদ্যুৎ বিল ও কর্মচারীদের বেতন ভাতা প্রভৃতি) মেটানোর জন্য রাখতে হয়।
ওষুধ ও মূলধনের অর্থের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সাত থেকে আট লক্ষ টাকার মূলধন দিয়ে বাৎসরিক আনুমানিক পনের থেকে বিশ লক্ষ টাকার ওষুধ ক্রয়-বিক্রয় করা সম্ভব।

রিটেইল ফার্মেসী ব্যবস্থাপনা
সাধারণ ভাবে ব্যবস্থাপনা বিষয়টি যথেষ্ট জটিল, কারণ সমস্যাসমূহ নিরসনের জন্য কোন সুনিদিষ্ট সূত্র নেই। একই সমস্যা বিভিন্ন ব্যক্তি তাঁর নিজস্ব পদ্ধতিতে সমাধান করে থাকেন। এর জন্য প্রয়োজন হয় উচ্চতর বুদ্ধিমত্তা, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষমতা এবং দূরদৃষ্টি। ব্যবস্থাপনার গুরুদায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিকে ব্যবস্থাপক বলা হয়।

ব্যবস্থাপকের গৃহীত সিদ্ধান্ত দ্বারা প্রতিষ্ঠান সরাসরি প্রভাবিত হয়। তাই ব্যবস্থাপক নির্বাচনে সর্বোচ্চ সতর্কতা গ্রহণ করা উচিত। রিটেইল ফার্মেসীতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একজন ফার্মাসিস্ট ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সামাজিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের পাশাপাশি ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব একজন ফার্মাসিস্টকে করে তোলে অনন্য। তাই একজন ফার্মাাসিস্টকে তার ব্যবস্থপনার ক্ষেত্রসমূহ ভালভাবে জানতে হবে। এই ক্ষেত্রসমূহ একটি অন্যটির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। যে কোন সিদ্ধান্ত একাধিক ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করতে পারে। একটি ভুল সিদ্ধান্ত স্বাস্থ্যসেবায় বিপর্যয়ের পাশাপাশি সমগ্র ব্যবসাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। অন্যদিকে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রিটেইল ফার্মেসীর সুনাম ও সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব।

একজন ফার্মেসী ব্যবস্থাপককে মনে রাখতে হবে যে, ব্যবস্থাপনা সবসময় গতানুগতিক কাজ নয়। তাই নিয়মিত সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি একটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ঠিক করে সেই লক্ষ্য অনুযায়ী এগিয়ে যেতে হবে। তাঁর মূল লক্ষ্য দুইটি – প্রথমত, সামাজিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং দ্বিতীয়ত, ফার্মেসীকে একটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। দায়িত্বশীলতা, সততা, নতুন ওষুধের ধারনা, ওষুধ প্রস্তুতকারক সম্পর্কে ধারণা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কিত অগ্রগতির ধারণা, স্বকীয়তা ইত্যাদি বৈশিষ্টের সংমিশ্রণ একজন রিটেইল ফার্মেসী ব্যবস্থাপকের জন্য অত্যন্ত জরুরী।

একজন সফল ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব ও কর্তব্য আলোচনা করা হল-

১। পরিকল্পনা প্রণয়ন: ভবিষ্যৎ লক্ষ্য স্থির করে ব্যবস্থাপকের প্রধান কাজ হল, পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। প্রতিষ্ঠানকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান তা ব্যবস্থাপককেই স্থির করতে হবে। এর ফলে প্রয়োজনীয় তথ্য, লোকবল, পর্যাপ্ত স্থানের প্রয়োজনীয়তা, আয়-ব্যয় ইত্যাদি সর্ম্পকে ধারণা পাওয়া যাবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কি কি পদক্ষেপ নিতে হবে তাও বোঝা যাবে।

২। অর্থ ব্যবস্থাপনা: পরিকল্পনা প্রণয়নের পরপরই ব্যবস্থাপককে খাত নির্ধারণ করে সেই অনুযায়ী বাজেট ঠিক করতে হবে। এক্ষেত্রে মনগড়া কোন কিছু করা যাবে না। সাধারণ ভাবে দোকান ভাড়া, ওষুধ, আসবাবপত্র, কর্মচারীর বেতন, রেফ্রিজারেটর ইত্যাদি বিষয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
বাজেট নিধারণের পর অর্থের উৎস নিশ্চিত করতে হবে। অর্থের উৎসের ধরন অনুযায়ী বাজেট পুর্নবিন্যাস করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, কোন ব্যক্তি ব্যাংক লোন নিয়ে ওষুধের দোকান দিতে চান। এর জন্য তিনি ব্যাংকের কাছে বিশ লক্ষ টাকা লোন নিচ্ছেন। ব্যাংক তাকে পুরো টাকা একবারে না দিয়ে ত্রৈমাসিক কিস্তিতে টাকা দিতে রাজি হল। এক্ষেত্রে উক্ত ব্যক্তিকে একটি ত্রৈমাসিক বাজেট প্রণয়ন করতে হবে এবং লক্ষ্য রাখতে হবে যে, প্রতি তিন মাসে খরচ কোনভাবেই যেন পাঁচ লক্ষ টাকা ছাড়িয়ে না যায়।
একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যবস্থাপক তার সম্ভাব্য ব্যয় এবং সম্ভাব্য অর্থের উৎস সর্ম্পকে ধারণা করে পরিকল্পনা প্রনয়ন ও বাস্তবায়ন করবেন। অন্যথায় প্রতিষ্ঠান কখনই লাভজনক হবে না।

৩। পণ্যদ্রব্য ব্যবস্থাপনা: ফার্মেসীর পণ্যদ্রব্যের অন্যতম হল ওষুধ। মূলধনের বৃহত্তম অংশ ব্যয় হয় পণ্যদ্রব্যের জন্য। সুতরাং এ বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন হবে হবে। এ ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য হল রোগী ওষুধ না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছে – এমনটি যেন না হয়।
কি ধরনের ওষুধ দোকানে মজুদ করতে হবে তা মূলত নির্ভর করে ঐ এলাকায় কি কি রোগ সচরাচর হয় এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের উপর। এক্ষেত্রে ডাক্তারের প্রেসক্রিশন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যে সব ওষুধ কম চলে তা বেশি পরিমাণে মজুদ করা যাবে না। এছাড়া প্রস্তুুতকারক কর্তৃক নিদের্শিত ব্যবস্থাপনায় ওষুধ সংরক্ষণ করতে হবে।
বিক্রয় প্রতিনিধি দ্বারা প্ররোচিত হয়ে নিম্নমানের ওষুধ মজুদ করা যাবে না। ওষুধ কখন অর্ডার দিতে হবে, একই ওষুধ একাধিকবার অর্ডার দেওয়া হল কিনা, ওষুধ দোকানে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় সময়, যেসব ওষুধের মেয়াদ অচিরেই শেষ হয়ে যাবে তার তালিকা তৈরি, মেয়াদোর্ত্তীণ ওষুধ সরিয়ে ফেলা, ইত্যাদি বিষয়েও ব্যবস্থাপককে সচেতন হতে হবে।

৪। কর্মচারী ব্যবস্থাপনা: সৎ, দক্ষ এবং সচেতন কর্মচারী ছাড়া একটি রিটেইল ফার্মেসী সফল হতে পারে না। দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা জন্য কর্মচারীরা ব্যবস্থাপকের হাতিয়ার। তাই কর্মচারী নির্বাচনের সময় ব্যবস্থাপককে অত্যন্ত সচেতন হতে হবে। এসময় শিক্ষার পাশাপাশি কর্মচারীর আচার, আচরণ ও তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষা (Aptitude Test) নেওয়া যেতে পারে। নিয়োগের পর প্রত্যেককে তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ ভাগ করে দিতে হবে। এছাড়া কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতা অনুযায়ী কর্মচারীদের বেতন ভাতা নির্ধারণ করতে হবে। অন্যথায় তাদের কর্ম¯পৃহা কমে যাবে এবং অন্যত্র চলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিবে। কম বেতনের অদক্ষ কর্মচারীর চেয়ে বেশি বেতনের দক্ষ কর্মচারী অনেক বেশি কার্যকর।

৫। অন্যান্য উপকরণ ব্যবস্থাপনা: আসবাবপত্র, সেলফ, আলমারী, কম্পিউটার, রেফ্রিজারেটর, ক্যাশ মেমো, প্যাকেট ইত্যাদি ব্যবস্থাপনার দিকেও ব্যবস্থাপককে নজর দিতে হবে। উপকরণ ক্রয়ের সময় তার দীর্ঘস্থায়িত্বের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। যেসব উপরকণ অব্যবহারযোগ্য তা দ্রুত পরিবর্তন করতে হবে। বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। এছাড়া ফার্মেসীতে অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা রাখতে হবে।

৬। দৈনন্দিন কাজ নিয়ন্ত্রণ: রিটেইল ফার্মেসীর দৈনন্দিন কার্যকক্রমের একটি বড় অংশ হল ওষুধ বিতরণ এবং বিক্রয়। একটি সফল ফার্মেসীতে সারাদিন ভিড় থাকে। অনেক সময় তৎক্ষণাৎ প্রয়োজনীয় ওষুধের তাড়া থাকে। কখনও কখনও দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকেও ফার্মেসীতে নিয়ে আসা হয়। ব্যবস্থাপককে দক্ষ হাতে এসব কাজ সামলাতে হবে। কর্মচারীরা যেন রোগী বা ক্রেতাকে বেশিক্ষণ দাঁড় করিয়ে না রাখে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। প্রতিদিন বিক্রিত ওষুধের তালিকা করে তা মজুদের সাথে সামঞ্জস্য করা উচিত। এক্ষেত্রে আধুনিক কম্পিউটার ব্যবহার করা যেতে পারে।

unnamed-2

ড. মোঃ শাহ এমরান
অধ্যাপক
ফার্মাসিউটিক্যাল কেমেস্ট্রি বিভাগ,ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
কো-অরডিনেটর,মলিকুলার ফার্মাকোলজি ও হারবাল ড্রাগ রিসার্চ ল্যাবোরেটরী
কনভেনার,“দ্যা ফার্মেসি গিল্ড অফ বাংলাদেশ (PGB)”।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 1632 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ