রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের ‘যুদ্ধ’

Print

%e0%a6%b0%e0%a7%8b%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%93%e0%a6%aa%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0মিয়ানমার বছরের পর বছর ধরে দেশটির রোহিঙ্গা মুসলমান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, বিয়ে, ধর্মীয় উপাসনা, এমনকি শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার অস্বীকারের মাধ্যমে চলছে এ নির্যাতন-নিপীড়ন। ২০১২ সালে বৌদ্ধ চরমপন্থীদের সহিংসতা শুরু হওয়ার পর হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে বাড়িঘর হারাতে হয়েছে। তাদের অনেকে প্রাণ বাঁচাতে পাচারকারী ও চোরাচালানকারীদের নৌকায় করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এক লাখের বেশি নোংরা ও কারাসদৃশ ক্যাম্পে জীবন কাটাচ্ছেন তারা। বর্তমানে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত অপারেশনে আবারও হাজার হাজার রোহিঙ্গা তাদের গ্রাম ও বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ক্রমবর্ধমান সহিংসতা থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে গত রোববার ও সোমবার কয়েকশ’ রোহিঙ্গা মুসলমান মিয়ানমার থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা আইওএমের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সীমান্তের কাছে পাহাড়ে তাদের আশ্রয় শিবিরগুলোতে ৫শ’রও বেশি মানুষকে প্রবেশ করত দেখেছেন তিনি। এ ছাড়া চীন-মিয়ানমার সীমান্তে নিরাপত্তা বাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘর্ষের খবর দিয়েছে রয়টার্স।
৯ অক্টোবর রাখাইন রাজ্যে (আরাকান) সশস্ত্র আক্রমণকারীদের হামলায় ৯ পুলিশ সদস্য নিহত হয়। তারপরই চলমান সন্ত্রাসবিরোধী অপারেশন শুরু করে সেনাবাহিনী। কারা ওই হামলা চালিয়েছে তা স্পষ্ট নয়। মাদক-চোরাচালানকারী বা ইসলামপন্থী সন্ত্রাসীরা ওই হামলা করেছে- এমন ধারণা প্রচলিত আছে। হামলার পর থেকে সামরিক বাহিনী শতাধিক মানুষকে হত্যা করেছে। যাদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কর্তৃক প্রকাশিত স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, ২২ অক্টোবর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামে কমপক্ষে ৪৩০টি বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সেনারা নিরস্ত্র মানুষদের হত্যা করছে, নারীদের ধর্ষণ করছে ও লুটতরাজ চালাচ্ছে- এমন অসংখ্য বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ পাওয়া গেছে। যদিও সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করছে। ৯ অক্টোবর রাখাইনে হামলার তদন্তকারী উ অং উইন বলেছেন, সেনারা রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ করতে পারে না, কারণ তারা ‘খুবই নোংরা’।
৯ অক্টোবরের হামলা সরকারের একটি পূর্ব ঘোষণার কারণে সাজানো হতে পারে। সরকার ঘোষণা দিয়েছিল, ওই এলাকার ‘অবৈধ’ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ ও ধ্বংস করে দেয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। যার মধ্যে আছে ২ হাজার ৫০০ বাড়ি, ৬০০ দোকান, এক ডজন মসজিদ ও ৩০টির বেশি স্কুল। রোহিঙ্গাদের এক সদস্য এবং ডেমোক্রেসি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস পার্টির চেয়ারম্যান উ কিয়াও মিন বলেছেন, সরকারের ওই উচ্ছেদ পরিকল্পনায় বলা হচ্ছিল, ‘আমাদের অবশ্যই রোহিঙ্গা জনসংখ্যা কমাতে হবে।’
মাত্র এক বছর আগে, ঐতিহাসিক নির্বাচনের পর দীর্ঘ সময়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী, নোবেলজয়ী অং সান সু চি মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হন। এতে আশার সঞ্চার হয়েছিল, তিনি রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ ভোগান্তির অবসান ঘটাবেন। সেপ্টেম্বরে ওবামা প্রশাসন মিয়ানমারের ওপর থেকে অবশিষ্ট অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেয়। তখন মিয়ানমারের অন্যান্য অর্জনের পাশাপাশি এ কথাও বলা হয়, নতুন সরকার ‘তার নাগরিকদের মানবাধিকারের প্রতি সম্মান দেখানোর ওপর’ জোর দিচ্ছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে এমন কথা বলাটা ছিল অপরিপক্ব। সু চি নিজেই রোহিঙ্গাদের ‘বিদেশী’ নাগরিক হওয়ার হাস্যকর দাবিকে জোরালো করেছেন। তাদের ‘বাঙালি’ বলেই এটা করেছেন এক সময় ‘বিবেকের দূত’ উপাধী পাওয়া সু চি। একই সঙ্গে হামলার জবাবে সরকারের দমন-পীড়নমূলক অবস্থানকে ‘আইনের শাসনের ওপর ভিত্তি করে’ বলে দাবি করেছেন তিনি।
এদিকে নির্যাতনের শিকার মানুষের কাছে ওই এলাকায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর বেশিরভাগ পথও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, অপুষ্টির শিকার হাজার হাজার শিশু ক্ষুধা ও চিকিৎসা সেবার স্বল্পতার ঝুঁকিতে রয়েছে। সরকারকে অবশ্যই অভাবীদের কাছে অবিলম্বে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানোর অনুমোদন দিতে হবে। জাতিসংঘ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চলমান সহিংসতার নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানাচ্ছে। অন্যদিকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সরকারের কাছে দাবি করছে সহায়তার জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানানোর। যদি মিসেস সু চি মানবাধিকারের একজন চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নিজের খ্যাতি ধরে রাখতে চান, তাহলে তাকে এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 53 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ