রোহিঙ্গা: ইতিহাস, সমস্যা ও সমাধান

Print

রোহিঙ্গারা পশ্চিম মায়ানমারের রাখাইন স্টেটের উত্তরাংশে বসবাসকারী একটি জনগোষ্ঠী। ধর্মের বিশ্বাসে এরা অধিকাংশই মুসলমান। রাখাইন স্টেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হল রোহিঙ্গা। মায়ানমারের সরকারী হিসেব মতে, প্রায় আট লক্ষ রোহিঙ্গা আরাকানে বসবাস করে। রোহিঙ্গারা বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠীগুলোর একটি।

মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মায়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। মায়ানমার সরকার ১৩৫ টি জাতিগোষ্ঠীকে সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, রোহিঙ্গারা এই তালিকার অর্ন্তভুক্ত নয়। মায়ানমার সরকারের মতে, রোহিঙ্গারা হল বাংলাদেশী, যারা বর্তমানে অবৈধভাবে মায়ানমারে বসবাস করছে। যদিও ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। ইতিহাস বলে, রোহিঙ্গারা মায়ামারে কয়েক শতাব্দী ধরে বসবাস করে আসছে।

সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হয়। প্রাথমিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যীয় মুসলমান ও স্থানীয় আরাকানীদের সংমিশ্রণে রোহিঙ্গা জাতির উদ্ভব। পরবর্তীতে চাঁটগাইয়া, রাখাইন, আরাকানী, বার্মিজ, বাঙালী, ভারতীয়, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষদের মিশ্রণে উদ্ভুত এই সংকর জাতি এয়োদশ-চর্তুদশ শতাব্দীতে পূর্ণাঙ্গ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পঞ্চদশ শতাব্দী হতে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত আরাকানে রোহিঙ্গাদের নিজেদের রাজ্য ছিল।

মায়ানমার সরকারের দাবি, রোহিঙ্গারা হল ভারতীয়, বাঙালী ও চাঁটগাইয়া সেটলার, যাদেরকে ব্রিটিশরা আরাকানে এনেছে। যদিও ঐতিহাসিকভাবে এটি প্রতিষ্ঠত যে, ব্রিটিশরা বার্মায় শাসক হিসেবে আসার কয়েক শতাব্দী আগে হতেই রোহিঙ্গারা আরাকানে পরিষ্কার জাতি হিসেবে বিকশিত হয়েছিল।

মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার না করায় সকল প্রকার নাগরিক ও মৌলিক সুবিধা হতে বঞ্চিত রোহিঙ্গারা। মায়ানমারে ভ্রমণ, শিক্ষা, চিকিৎসার জন্য পরিচয় পত্র থাকাটা খু্ব জরুরি বিষয়। কিন্তু মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের পরিচয় পত্র ইস্যু করে না, ফলে, এমনিতেই পিছিয়ে পড়া রোহিঙ্গারা আরো পিছিয়ে পড়ছে।

মায়ানমার সরকারের ভূমি ও সম্পত্তি আইন অনুসারে বিদেশীরা কোন সম্পত্তি ও ভূমি মালিক হতে পারে না। রোহিঙ্গারা মায়ানমার সরকারের দৃষ্টিতে অবৈধ অভিবাসী তথা, বিদেশী। তাই, রোহিঙ্গারা কোন ভূমি বা, স্থায়ী সম্পত্তির মালিক হতে পারে না। বর্তমানে যেসকল ভূমিতে রোহিঙ্গারা বসবাস করছে, মায়ানমার সরকার যেকোন মুহুর্তে সেগুলো দখল করে নিতে পারে।

মায়ানমার সরকার আইনের মাধ্যমে রীতিমত অসহনীয় করে তুলেছে রোহিঙ্গাদের জীবন। রোহিঙ্গারা সরকারী চাকুরী করতে পারে না, সরকারী কোন দপ্তরে রোহিঙ্গা কোন সেবা পায় না, ব্যাংকে লেনদেন করতে পারে না, সরকারী চিকিৎসা কেন্দ্রের সেবা গ্রহণ করতে পারে না, উপযোগ সেবার (বিদ্যুত, পানি, জ্বালানী) জন্য আবেদন করতে পারে না, স্বপরিচয়ে শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে ভর্তি হতে পারে না। প্রায় ৮০% রোহিঙ্গা বাস্তবিক অর্থে অশিক্ষিত।

প্রায়ই মায়ানমার সরকার কর্তৃক রোহিঙ্গা নিপীড়ণের খবর পাওয়া যায়। রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক শ্রমিক হিসেবে খাটানো হয়। প্রায়শ স্থানীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন লোকালয়ে হানা দেয়। শহরের সৌন্দর্য্য বর্ধন, সরকারী জমি অধিগ্রহণের নামে রোহিঙ্গাদের অনেকগুলো মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়। এর মধ্যে প্রাচীন কিছু মসজিদও আছে। অনেক রোহিঙ্গাদের ব্যবসায় দখল/বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য ‘গ্যাটো’ জাতীয় বিশেষ ধরণের ব্যবস্থা করেছে। রোহিঙ্গাদের জন্য বেশ কয়েকটি বিশেষ বসবাসের স্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা থেকে ওরা অনুমতি ছাড়া বের হতে পারে না। সেই গ্যাটোগুলোর ভিতরে আবদ্ধ মানবেতর জীবনযাপন করে রোহিঙ্গারা। চিকিৎসা, শিক্ষা ও উপযোগ সেবার ব্যবস্থা এই গ্যাটোগুলোতে থাকলেও, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল ও নিম্নমানের।

রোহিঙ্গাদের বিয়ে করার জন্যও স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি নেয়া লাগে। এছাড়া দুটোর বেশি সন্তান নেয়া রোহিঙ্গাদের জন্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রশাসনের অনুমতি না নিয়ে বিয়ে করায় ও দুজনের বেশি সন্তানের জন্ম দেয়ায় রোহিঙ্গা পরিবারের সন্তানদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। এদের সংখ্যা প্রায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার। এইসব পরিবারের সন্তানরা সরকারের ‘গ্যাটো ব্যবস্থা’ তালিকাভুক্ত নয়, ফলে, এদের জীবন ফোঁড়ার উপরে বিষ ঘা এর মত। এরা গ্যাটোগুলোতে থাকতে পারে না। আবার, গ্যাটোর বাইরেও থাকতে পারে না, কারণ, মায়ানমারের নাগরিক নয় ওরা। অবস্থাটা ওদের এমন যে, মায়ানমার সরকার ওদের কোন অস্তিত্বই স্বীকার করে না। এইসব পরিচয়হীন রোহিঙ্গারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডের পথে পা বাড়ায়। নৌপথে সীমান্ত পাড়ি দিতে গিয়ে অসংখ্য রোহিঙ্গা ঢুবে মারা গেছে।

বিগত কয়েক দশক ধরে মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশ সীমান্তে পুশ ইন করছে। রুটিনমাফিক নির্যাতন করে রোহিঙ্গাদের বাধ্য করছে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে। বর্তমানে সাত লক্ষের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রিত অবস্থায় বসবাস করছে। যদিও রিফিউজি হিসেবে বাংলাদেশে তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা আরো কম।

রোহিঙ্গাদের প্রতি যা করছে মায়ানমার সরকার, তা সমগ্র মানবতার বিরুদ্ধেই অপরাধ। এক হাজার বছরের বেশি সময় ধরে আরাকানে বিকশিত হতে থাকা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব সুবিধা না দেয়া, গ্যাটো সৃষ্টি করে সেখানে অমানবিক পরিবেশে থাকতে বাধ্য করা, জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োগ করা, বিচারবর্হিভূতভাবে গ্রেফতার করা, মালিকানাস্বত্ব, সার্বজনীন শিক্ষা, চিকিৎসা, উপযোগ সেবা ও মৌলিক মানবাধিকার হতে বঞ্চিত করার মাধ্যমে নিমর্মতার শেষ সীমানাটুকু অতিক্রম করেছে মায়ানমার সরকার।

মায়ানমার সরকারের নিপীড়ণের সাথে নতুন করে যোগ হয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। রোহিঙ্গা বিরুদ্ধে রাখাইনসহ অন্যান্য বৌদ্ধ আরাকানীদের উস্কানি দিচ্ছে মায়ানমার সরকার। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বে বৌদ্ধ মৌলবাদকে সরাসরি ইন্ধন ও মদদ যোগাচ্ছে মায়ানমার সরকার।

মায়ানমার সরকারের মনে রাখা দরকার, নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর মাঝে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, সুসংগঠিত অপরাধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। রোহিঙ্গাদের ক্রমাগত নিপীড়ণ করে ওদেরকে চরমপন্থার দিকেই ক্রমশ ঠেলে পাঠাচ্ছে মায়ানমার সরকার।

বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গা:

উপরে বলা হয়েছে, মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের মায়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি এবং আরাকান সরকারের মতে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশী। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে এটি সত্য যে, রোহিঙ্গারা মায়ানমারের আরাকানের উত্তরাঞ্চলের স্থায়ী অধিবাসী। কিন্তু তারপরও অর্ধশতাব্দী ধরে, মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’ করেছে।

◘ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান বার্মা দখল করলে বার্মিজ জাতীয়তাবাদী ও জাপানীরা মিলে রোহিঙ্গাদের গণহত্যা, জাতিগত ধোলাই শুরু করে। এসময় প্রায় পঞ্চাশ হাজার রোহিঙ্গা ভারত উপমহাদেশের বিভিন্নি অঞ্চলে পালিয়ে আসে।

◘ জেনারেল নে উইনের সময় আশির দশকে আদমশুমারির সময় রোহিঙ্গাদের বিদেশী ঘোষণা করে নিপীড়ণ করা। এসময় প্রায় দুই লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। উদ্বাস্তুরা গণহত্যা, ধর্ষণ, সন্তান চুরিসহ নানান ধরণের জাতিগত ধোলাইয়ের অভিযোগ আনে।

◘ ১৯৯১-৯২ সালে The State Law and Order Restoration Council (SLORC) এর মাধ্যমে মায়ানমার সরকার উত্তর রাখাইন স্টেটে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের দমনের নামে রোহিঙ্গাদের জাতিগত ধোলাই শুরু করে। এসময় মায়ানমারের সৈন্য ও স্থানীয় রাখাইনরা রোহিঙ্গাদের হত্যা, ধর্ষণ, শিশু চুরি, গ্যাটোতে স্থানান্তর, মসজিদ ভেঙে দেয়া, ধর্মপালনে বাধা দেয়া, বাংলাদেশে পুশ ইনসহ সামরিক ক্যাম্পে বাধ্যতামূলক শ্রমে বাধ্য করে। এসময় বাংলাদেশে লক্ষাধিক রোহিঙ্গা পালিয়ে আসে।

◘ এছাড়া, আশির দশক হতে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রতিনিয়ত মায়ানমার সরকারের নিপীড়ণের শিকার হয়ে অসংখ্য রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে।

জাতিসংঘ ও আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়ের চাপে মায়ানমার সরকার কিছু রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিলেও তা সংখ্যায় অতি নগণ্য। এছাড়া, ফেরত নেয়া রোহিঙ্গাদের আগের মতই নিপীড়ণ করছে মায়ানমার সরকার। ফলে, পরিস্থিতি আগের মতই রয়ে গেছে। এখনো অসংখ্য রোহিঙ্গা মায়ানমার সরকারের নিপীড়ণের শিকার হয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে।

এই নিপীড়িত রোহিঙ্গারা সহজেই বাংলাদেশের মুসলিম জঙ্গি গোষ্টীর শিকারে পরিণত হয়। বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের আরাকানে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখিয়ে জঙ্গি সংগঠনগুলো এদের জঙ্গি হিসেবে রিক্রুট করে। বাংলাদেশে জঙ্গি সংগঠনগুলোর কর্মীদের একটি বড় অংশ রোহিঙ্গা।

রোহিঙ্গা ইস্যু, ২০১২:

দুই তিনজন রোহিঙ্গা দুষ্কৃতিকারী এক রাখাইন নারীকে ধর্ষণ ও হত্যাকে কেন্দ্র করে জুন, ২০১২ তে শুরু হয় রাখাইন-রোহিঙ্গা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এক পর্যায়ে, মায়ানমারের সামরিক বাহিনী ও রাখাইন বৌদ্ধ মৌলবাদীরা মিলে রোহিঙ্গাদের উপর জাতিগত ধোলাই শুরু করে। হাজার হাজার ঘরবাড়ি ছাড়া নিপীড়িত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করার চেষ্টা করে। বাংলাদেশ সরকারের নতুন করে আরো রোহিঙ্গা শরণার্থী গ্রহণের অনিচ্ছার কারণে উদ্বাস্তু রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে না। তবে, বাংলাদেশ সরকার বিজিবির মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের যতটুকু সম্ভব মানবিক সাহায্য দিয়েছে। কিন্তু দুর্গম সীমান্ত দিয়ে ঠিকই হাজার হাজার নিপীড়িত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে।

২০১২ সালের দাঙায় মারা যায় প্রায় শতাধিক রোহিঙ্গা এবং গৃহহীন হয় প্রায় লক্ষাধিক রেহিঙ্গা।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে রোহিঙ্গাদের যা যা করণীয় হতে পারে:

◘ রোহিঙ্গা জাতিকে একটি কার্যকরী পরিষদ গঠন করে, তার অধীন একতা বদ্ধ করা।

◘ সেই কার্যকরী পরিষদের মাধ্যমে আর্ন্তজাতিক মঞ্চে রোহিঙ্গাদের শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব সৃষ্টি করা।

◘ সকল রোহিঙ্গার একটি ডাটাবেইস তৈরীর উদ্যোগ গ্রহণ।

◘ রোহিঙ্গাদের শিক্ষা ও প্রাথমিক চাহিদাপূরণে প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহে ও তার ব্যবস্থাপনায় জাতিসংঘের সাথে একযোগে কাজ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা।

◘ মুসলমান জঙ্গিবাদ ও জঙ্গি সংগঠন বিরোধী কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করা।

◘ রোহিঙ্গা জনগোষ্টির মাঝে মুসলমান জঙ্গিবাদ বিরোধী মতাদর্শ প্রচার করা।

◘ রোহিঙ্গা জনগোষ্টির মাঝে মুসলমান জঙ্গিবাদ যাতে প্রসার লাভ না করতে পারে, তার জন্য কর্মসূচী হাতে নেয়া।

◘ আর্ন্তজাতিক মানবাধিকার আদালতে মায়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে প্রমাণসহ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ।

◘ বিশ্বে জনমত সৃষ্টির জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা ও কর্মসূচী হাতে নেয়া।

◘ আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায় ও সংগঠনগুলোকে প্রভাবিত করা যাতে আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায় ও সংগঠনগুলো মায়ানমার সরকারকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে চাপ সৃষ্টি করে।

◘ রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মায়ানমার যাতে বাধ্য হয়, সেজন্য প্রচলিত বৈধ পন্থায় আর্ন্তজাতিক আইন মেনে সামরিক-বেসামরিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের যা যা করণীয় হতে পারে:

◘ আর কোন রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না দেয়া।

◘ যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আছে, তাদের তালিকা তৈরী করা ও কড়া নজরদারীর ব্যবস্থা করা। রোহিঙ্গা নীতিমালা প্রণয়ন করা; যার মাধ্যমে উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের কি কি সুবিধা বাংলাদেশ সরকার প্রদান করবে, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে থাকতে হলে কি কি বিধিমালা মেনে চলতে হবে, তার উল্লেখ থাকবে।

◘ যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আছে, তাদের পর্যায়ক্রমে আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায় ও সংগঠনের সহায়তায় মায়ানমারে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা। এছাড়া, রোহিঙ্গা রিফিউজিদের তৃতীয় কোন দেশে প্রেরণের বিষয়ে প্রচেষ্টা চালানো।

◘ আর্ন্তজাতিক ও স্থানীয়ভাবে মায়ানমার সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে এবং আরাকানের উত্তরাঞ্চলে স্বায়ত্বশাসন দেয়।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আর্ন্তজাতিক সংগঠন ও সম্প্রদায়ের যা যা করণীয় হতে পারে:

◘ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের জন্য প্রয়োজনীয় সাহায্য প্রেরণ করা।

◘ মায়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে করে, মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের পূর্ণাঙ্গ নাগরিকত্ব প্রদান করে।

◘ আরাকানের উত্তরাঞ্চলে রোহিঙ্গাদের জন্য স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চলের ব্যবস্থা করা।

◘ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের মায়ানমারে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা।

◘ রোহিঙ্গাদের জন্য পূর্ণাঙ্গ পূর্নবাসন কর্মসূচী হাতে নেয়া।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মায়ানমারের যা যা করণীয় হতে পারে:

◘ ঐতিহাসিকভাবে এটা প্রমাণিত যে, রোহিঙ্গারা আরাকানের স্থায়ী অধিবাসী। তাই, মায়ানমার সরকারের উচিত রোহিঙ্গাদের পূর্ণাঙ্গ নাগরিকত্ব প্রদান করা।

◘ রোহিঙ্গাদের জন্য কমপক্ষে পঁচিশ বর্ষব্যাপী উন্নয়ণ পরিকল্পনা গ্রহণ।

◘ মায়ানমারের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গাদের জন্য যে গ্যাটোগুলো আছে, সেগুলোর অবসান ঘটিয়ে রোহিঙ্গাদের পূর্ণবাসন দেয়া।

◘ বিভিন্ন রাষ্ট্রে (বিশেষত: বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সৌদিআরব) যেসকল রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু আছে, তাদের মায়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে পূর্ণবাসন দেয়া।

◘ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঠেকাতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া।

◘ আরাকানের উত্তরাঞ্চলে রোহিঙ্গাদের জন্য স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চলের ব্যবস্থা করা।

………………….নিপীড়িত রোহিঙ্গারা মুসলিম জঙ্গি সংগঠনগুলোর কর্মী সংগ্রহের একটি বড় উৎস। আরাকানে স্বাধীন রোহিঙ্গা রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখিয়ে মুসলিম জঙ্গি সংগঠনগুলো রোহিঙ্গাদের জঙ্গি হিসেবে রিক্রুট করছে।

মায়ানমার সরকারের মনে রাখা উচিত, ‘নীতিগত সন্ত্রাসবাদের’ একটি বড় কারণ হল জাতিগত ধোলাই। রোহিঙ্গাদের জাতিগত নিপীড়ণ করে মায়ানমার সরকার একটি ভয়ংকর ‘নীতিগত সন্ত্রাসী’ গোষ্টী ব্যাতীত অন্য কিছু সৃষ্টি করছে কি?

বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ড রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়দাতা। এই দুটো দেশে মুসলিম জঙ্গি কর্মীদের একটি বড় উৎস হল রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গাদের নিপীড়ণ করে জঙ্গিদের রাস্তায় পাঠানোর মাধ্যমে মায়ানমার শুধু নিজের পায়ে কুড়োল মারছে না, বরং বাংলাদেশ, মায়ানমার, থাইল্যান্ডসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই অঞ্চলে স্থায়ী একটি সমস্যা সৃষ্টি করেছে, যা বর্তমানে বৃহৎ আকারে পরিণত হচ্ছে, এর দায় কে নেবে?

রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশের রামুর বৌদ্ধ নিপীড়ণ:

সম্প্রতি বাংলাদেশে বৌদ্ধদের উপর নিপীড়ণ সংঘটিত হয় (০১,০২,০৩)।এই নিপীড়ণে রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
‘নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর মাঝে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা, সংগঠিত অপরাধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে’—রোহিঙ্গারা তা প্রমাণ করল।
সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ, দোষীদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

বাংলাদেশে অনেক সুযোগসন্ধানী বলছে- ‘রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয়দানকে সমর্থন করা উচিত ছিল। আপনারা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেননি, এখন রামুর বৌদ্ধদের প্রতি কেন এত সহানুভূতি?’
এধরণের সুযোগ-সন্ধানীর উদ্দেশ্যে বলব: রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয়দানকে সমর্থন করলে মানবতাবাদী হওয়া যাবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। নতুন রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের বাংলাদেশে আশ্রয়দানের বিরোধিতা করার যথেষ্ট কারণ আছে (উপরে বলা হয়েছে)।

‘মায়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যু’ ও ‘সাম্প্রতিক রামুর বৌদ্ধ নিপীড়ণ ইস্যু’ দুটোর সাথে তুলনা করাটাই চরম বাজে বিষয়।
রোহিঙ্গারা নিপীড়িত, রামুর বৌদ্ধরাও নিপীড়িত। মানুষ হিসেবে দুপক্ষের জন্যই আমার সহানুভূতি আছে । কিন্তু বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ঢুকতে দেয়াকে সমর্থন করা বর্তমান সময়ের জন্য চরম বোকামীর সিদ্ধান্ত। আর রোহিঙ্গারা আমাদের জন্য কতবড় বিষফোঁড়া তা রামুর ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে গেছে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 59 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ