লোডশেডিংয়ে জনদুর্ভোগ

Print

তেলের অভাবে বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হচ্ছে। দু-একদিনের মধ্যে লোডশেডিং সমস্যা কমবে -প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ

বিদ্যুৎ না থাকায় তীব্র পানি সংকট দেখা দিয়েছে। পাম্পে এসেও মিলছে না পানি। ছবিটি বুধবার মধ্য বাসাবো থেকে তোলা – মাহবুব হোসেন নবীন
সবুজ ইউনুস ও হাসনাইন ইমতিয়াজ
রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে প্রচণ্ড গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। নিদারুণ দুর্ভোগের কবলে পড়েছে সাধারণ মানুষ। রাজধানী ঢাকাতেই বিভিন্ন স্থানে দুই থেকে পাঁচবার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। সারাদেশের শহর-গ্রামের অবস্থা আরও খারাপ। সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা, এমনকি গভীর রাতেও বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে। গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিশু ও বৃদ্ধরা। বিভিন্ন শহরে খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ব্যাহত হচ্ছে সেচ কার্যক্রম। লোডশেডিংয়ের কারণে অফিস-আদালতেও স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই ক্ষোভ ব্যক্ত করছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গত কয়েক দিনের লোডশেডিংয়ের জন্য বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ মূলত নৌ ধর্মঘটকে দায়ী করেন। গতকাল সমকালকে তিনি বলেন, ধর্মঘটের কারণে তেল স্বল্পতায় ৭০০ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়নি। বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি তেলের নিজস্ব মজুদ থাকার কথা থাকলেও অনেকের মজুদাগার নেই। ফলে তেলের অভাবে কয়েক দিন ধরে বহু কেন্দ্র বন্ধ রাখতে হয়েছে। বহু কেন্দ্রে উৎপাদনও কমিয়ে দেওয়া হয়। কবে নাগাদ সমস্যা সমাধান হতে পারে_ জানতে চাইলে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামী দু-তিন দিনের মধ্যে লোডশেডিং সমস্যা কমবে। তিনি আরও জানান,

বিদ্যুতের মূল জ্বালানি হলো গ্যাস। গ্যাসের অভাবে এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এই গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর খুব বেশি সুযোগ নেই। বহু সচল বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাসের অভাবে অচল বসে আছে।

গতকাল বুধবার সারাদেশের গ্রাম ও শহর এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে নিয়োজিত পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) জেলা প্রশাসক ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি দিয়েছে। আরইবির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আতাউল হক মোল্লা স্বাক্ষরিত এ চিঠিতে বলা হয়েছে, সারাদেশে আরইবির বিদ্যুতের চাহিদা দৈনিক চার হাজার ৮০৭ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ করা হচ্ছে দুই হাজার ৭৬১ মেগাওয়াট। ঘাটতি থাকছে দুই হাজার ৪৬ মেগাওয়াট। এতে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ বেড়েছে। বিভিন্ন স্থানে জনরোষ সৃষ্টি হচ্ছে। বিদ্যুতের দাবিতে গ্রাহকরা বিভিন্ন কর্মসূচি দিচ্ছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। এ জন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা প্রশাসনের কাছে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ আশা করছেন।

ঢাকা, চট্টগ্রামসহ মহানগরগুলোতে লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে পানি সরবরাহেও। রাজধানীজুড়ে পানি সংকট চলছে। বারবার বিদ্যুতের যাওয়া-আসায় বাড়ির মালিকরা প্রয়োজনমতো পানির ট্যাঙ্ক ভরতে পারছেন না। ফলে বিভিন্ন এলাকার ওয়াসার পাম্পগুলোতে দেখা দিয়েছে দীর্ঘ লাইন। কিন্তু দুর্ভোগ এখানেও পিছু ছাড়ছে না। দীর্ঘ তিন-চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এদিকে বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক সময়ই ওয়াসার পাম্প বন্ধ থাকছে। ওয়াসার বহু পাম্পে জেনারেটর নেই। পানির দাবিতে বিভিন্ন এলাকায় মিছিল ও পাম্প অবরোধের মতো ঘটনাও ঘটছে।

পিডিবি সূত্র জানায়, বুধবার সারাদেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ধরা হয়েছিল আট হাজার ৩০০ মেগাওয়াট। সর্বোচ্চ উৎপাদন হয় সাত হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং করতে হয় ৯০০ মেগাওয়াট। এটা সরকারি হিসাব। কিন্তু বিদ্যুৎ প্রকৌশলীরা জানান, প্রকৃত চাহিদা ৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। ফলে লোডশেডিং দেড় হাজার মেগাওয়াটের মতো।

সারাদেশে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের দায়িত্বে নিয়োজিত পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানি সংকটে বর্তমানে ১৮টি কেন্দ্রের এক হাজার ২২৮ মেগাওয়াট উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এর মধ্যে তেল সংকটে ৩৯০ মেগাওয়াট বসে আছে। বন্ধ রয়েছে ফার্নেস অয়েলচালিত নোয়াপাড়া কেন্দ্রে ৪০ মেগাওয়াট, হরিপুর এনইপিসির ৯৭ মেগাওয়াট ও ডিজেলচালিত মেঘনাঘাট কেন্দ্রে ১০৫ মেগাওয়াট, সিদ্ধিরগঞ্জের কুইক রেন্টালের ৯৮ মেগাওয়াট ও পাগলায় ৫০ মেগাওয়াট।

গ্যাসের ঘাটতির কারণে বহু কেন্দ্রে উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো_ ভোলা কেন্দ্রে ১০১ মেগাওয়াট, হরিপুর পাওয়ারের ১৯ মেগাওয়াট, সিদ্ধিরগঞ্জ কেন্দ্র ৪০ মেগাওয়াট, সিদ্ধিরগঞ্জ কেন্দ্র ১৫০ মেগাওয়াট, টঙ্গী কেন্দ্রে ১০৫ মেগাওয়াট, শিকলবাহায় দুই কেন্দ্রে ৯০ মেগাওয়াট, চট্টগ্রাম কেন্দ্রের দুই ইউনিটে ১৯০ মেগাওয়াট, আশুগঞ্জের তিন কেন্দ্রে ১০৬ মেগাওয়াট, চাঁদপুর কেন্দ্রে ১১৩ মেগাওয়াট ও সিলেট কেন্দ্রে ২৫ মেগাওয়াট। পানির অভাবে কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। পিডিবি জানায়, বিদ্যুৎ উৎপাদনের গ্যাসের প্রয়োজন ১৩০ কোটি ঘনফুট। পিডিবি পাচ্ছে ১১০ কোটি ঘনফুট।

এ ছাড়া সংরক্ষণ, মেরামত ও অন্যান্য কারণে দুই হাজার ৬৪ মেগাওয়াট বিদ্যুতের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। পিডিবি বলছে, এ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি দ্রুত চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উৎপাদন বেশ কিছুটা বাড়বে।

সারাদেশে লোডশেডিং ও মানুষের দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরেছেন সমকালের ব্যুরো অফিসের প্রতিবেদকরা। সংক্ষেপে তা তুলে ধরা হলো :

চট্টগ্রাম :চট্টগ্রাম ব্যুরো থেকে শৈবাল আচার্য্য জানান, বিদ্যুতের অভাবে সার্বিক জনজীবনে ব্যাপক দুর্ভোগ নেমে এসেছে। চট্টগ্রাম পিডিবি বলছে, বর্তমানে ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া বিতরণ সিস্টেমেও সমস্যা রয়েছে।

পিডিবি চট্টগ্রামের প্রধান প্রকৌশলী মো. আজহারুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ‘কারিগরি সমস্যা ও জরাজীর্ণ বিতরণ ব্যবস্থার কারণে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না।

নগরে কোথাও দিনে তিনবার, কোথাও আবার চার থেকে পাঁচবারও বিদ্যুৎ চলে যায়। আছদগঞ্জ খুইল্যা মিয়া মার্কেটের বাসিন্দা গৃহিণী কানিজ ফাতেমা বলেন, প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যায়।

বরিশাল :বরিশাল ব্যুরোপ্রধান পুলক চ্যাটার্জি জানান, ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটের কবলে পড়েছে বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চল। বরিশাল ও ভোলার তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস এবং তেলের সংকটের কারণে উৎপাদন প্রায় তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে।

সামিট বরিশাল পাওয়ার লিমিটেডের দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ১২০ মেগাওয়াট। যার জন্য প্রয়োজন হয় ৫০০ টন ফার্নেস অয়েল। গত দু-তিন দিন ধরে এ কেন্দ্রে ১৮ থেকে ২০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়নি। কারণ জ্বালানি সংকট। কেন্দ্রটির ব্যবস্থাপক আলী আহসান এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেছেন, বৃহস্পতিবারের মধ্যে সমস্যার সমাধান হবে।

সূত্র জানায়, গতকাল বুধবার পিক আওয়ারে চাহিদা ছিল ১১০ থেকে ১২০ মেগাওয়াট। সরবরাহ করা হয়েছে ৬৫ মেগাওয়াট। ফলে ঘন ঘন লোডশেডিং করা হচ্ছে।

রাজশাহী :রাজশাহী ব্যুরোপ্রধান সৌরভ হাবিব জানান, রাজশাহীতে সারাদিনে ৭ থেকে ৮ বার বিদ্যুৎ চলে যায়। এতে সার্বিক জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। উৎপাদন কমেছে শিল্প-কারখানায়। নগরীর বিনোদপুর এলাকার বাসিন্দা মাসুদ রানা ও অনিক মাহমুদ জানান, মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টায় চারবার বিদ্যুৎ গেছে। বাংলাদেশ রেশম শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি লিয়াকত আলী বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে শিল্প-কারখানার উৎপাদনে ব্যাপক সমস্যা দেখা দিয়েছে।

সিলেট :সিলেট ব্যুরো প্রধান চয়ন চৌধুরী জানান, নগরীতে লোডশেডিং সমস্যা নেই। তবে মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়। কিন্তু ঝড়-বৃষ্টির জন্য পাহাড়ি এলাকায় বিতরণ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন উপজেলায় বিদ্যুতের দুর্ভোগ আছে।

সিলেট বিভাগে প্রতিদিন বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ৪১৫ মেগাওয়াট। এখানে অনেকগুলো বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে। বর্তমানে উৎপাদন ক্ষমতা ১২শ’ মেগাওয়াটেরও বেশি। ফলে ঘাটতি নেই।

খুলনা :খুলনা ব্যুরোপ্রধান মামুন রেজা জানান, তাপদাহের মধ্যে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে নাকাল খুলনার মানুষ।

খুলনা ও বরিশাল বিভাগ এবং বৃহত্তর ফরিদপুরের ২১ জেলায় বিদ্যুৎ বিতরণ করে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো)। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ দিনে পিকআওয়ারে গড়ে লোডশেডিং ৩০০ মেগাওয়াট। এ জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।

ওজোপাডিকো থেকে জানা গেছে, গতকাল বুধবার বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খুলনায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৮৯০ মেগাওয়াট। সরবরাহ হয়েছে ৭২৩ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল ১৬৭ মেগাওয়াট। পিকআওয়ারে অর্থাৎ সন্ধ্যার পর থেকে লোডশেডিং আরও বেড়ে যায়।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 16 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ