শিক্ষিত লোকের সঙ্গ পেতে কলম বিক্রি

Print

%e0%a6%b6%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%bf%e0%a6%a4-%e0%a6%b2%e0%a7%8b%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97-%e0%a6%aa%e0%a7%87%e0%a6%a4%e0%a7%87-%e0%a6%95নাম তার আব্দুল কাদের মোল্লা। কলম বিক্রি তার পেশা। একদিন দু’দিন নয়, দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে পুরোনো ঢাকায় নিম্ন আদালত এলাকায় কলম বিক্রি করছেন।
আদালত এলাকায় তার স্থায়ী দোকান নেই। কখনো আদালত ভবনের বাড়ান্দায়, কখনো আদালত কক্ষের সামনে, কখনও সংশ্লিষ্ট জেনারেল রেজিস্ট্রার (জিআর) কক্ষের সামনে ঘুরে ঘুরে কলম বিক্রি করেন। আদালত ভবনের অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আইনজীবী তার কাছ থেকেই কলম কেনেন। হাস্যোজ্জ্বল মানুষটিকে সব সময় পান চিবাতে দেখা যায়। সকলের কাছেই তিনি ‘কলমওয়ালা’ নামেই পরিচিত।
কাদের মিয়ার সাথে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। কাদের মিয়া বলেন, ‘দরিদ্র পরিবারে জন্ম, তাই বেশিদূর পড়ালেখা করতে পারিনি। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ালেখা করেছি। এরপর মাদ্রাসায় পড়ালেখার চেষ্টা করেছি। আগ্রহ থাকলেও দারিদ্র্যের কারণে সেটা আর হয়ে ওঠেনি। কলম বিক্রি করে দিনে দুই’শ থেকে তিন’শ টাকা লাভ হয়। এ দিয়ে সংসার চালাতে খুব কষ্ট হয়। এরপরও এ পেশা ছাড়তে পারছি না। কারণ, মনের মধ্যে পড়ালেখা করতে না পারার বেদনা সব সময়ই কাজ করে। পাশাপাশি শিক্ষিত লোকদের সঙ্গে চলাফেরা করতে খুব ভালো লাগে। আর তাই তাদের সঙ্গ পেতেই কলম বিক্রি করছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘দুই বার বিদেশ গিয়ে টাকা মাইর খাইছি। তাই মাত্র ১০ হাজার টাকা দিয়ে এ ব্যবসা শুরু করি। পুরোনো ঢাকার চকবাজার, বাংলাবাজার ও বাবুবাজার থেকে পাইকারি দামে কলম সংগ্রহ করি। এরপর তা কোর্টে বিক্রি করি।’
বিক্রি কেমন হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঠিক নেই। কোন দিন এক হাজার টাকা, কোন দিন দেড় হাজার আবার কোন দিন দুই হাজার টাকাও বিক্রি হয়। কলম বিক্রি করে যা কামাই তা থেকে নিজে খরচ করি এবং গ্রামে পরিবারের কাছে কিছু পাঠাই। সাত থেকে আট হাজার টাকা গ্রামে পাঠাতে পারলেই চলে। কোর্ট এলাকাতে দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে ব্যবসা করছি। এ এলাকায় কত গ-গোল হয়, কিন্তু কেউই আমারে কিছু কয় না। কারণ, সবাই আমারে চেনে এবং জানে।’
পুরোনো ঢাকার নিম্ন আদালত প্রাঙ্গণে গেলে দেখা যাবে মধ্যবয়সী আব্দুল কাদের মিয়ার দুই হাতে কলমদানি। জামার দুটি পকেটও কলমে ঠাসা। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, তার মধ্যেও কলম। প্রতিদিন সকাল ৯টার মধ্যে আদালত চত্বরে চলে আসেন তিনি। বিকাল ৫টা পর্যন্ত এখানেই ঘোরাঘুরি করে কলম বিক্রি করেন।
তিনি জানান, সব ধরনের কলমই রয়েছে তার সংগ্রহে। পাঁচ টাকার কলম থেকে শুরু করে হাজার টাকার কলমও আছে তার ঝুলিতে। তবে কম দামের কলমগুলোই বেশি বিক্রি হয়। তাই সেগুলো থাকে কলমদানিতে। আর দামি কলম রাখেন শার্টের বুক পকেটে।
জানতে চাইলে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সহ-সভাপতি আবু বকর ফরহাদ বলেন, ‘আব্দুল কাদের মিয়া কোর্ট এলাকার পরিচিত মুখ। কোর্ট ভবনে ঘুরে ঘুরে তাকে কলম বিক্রি করতে দেখা যায়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এ পেশায় নিয়োজিত। সারাক্ষণই তার মুখে হাসি থাকে। সবাই তাকে কলমওয়ালা বলেই ডাকে।’
আব্দুল কাদের মিয়ার চার সন্তান। এক মেয়ে ও তিন ছেলে। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। বড় দুই ছেলের মধ্যে একজন টাইলসের কাজ করে, আরেকজন কোর্ট এলাকাতেই দোকানদারি করে। ছোট ছেলে নবম শ্রেণিতে পড়ে। ঢাকার নবাবপুরে একটি মেসে থাকেন তিনি। আর ছোট ছেলেকে নিয়ে স্ত্রী থাকেন গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে।
আব্দুল কাদের মিয়া বলেন, ‘বড় দুই ছেলেকে পড়াশোনা করানোর জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু ওরা পড়ালেখা করেনি। আল্লাহ’র রহমতে ছোট ছেলে পড়ালেখায় খুব মনোযোগী। অষ্টম শ্রেণিতে সে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাইছে। আশা আছে, যতদূর সম্ভব ওর (ছোট ছেলের) পড়ালেখা চালিয়ে নেব। আর এটাই এখন আমার একমাত্র প্রতিজ্ঞা। সবাই ওর জন্য দোয়া করবেন, সে যেন পড়ালেখা শিখে মানুষের মত মানুষ হতে পারে।’

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 222 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
error: