শুরুতেই হোঁচট খেলেন আইভী

Print

%e0%a6%b6%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%a4%e0%a7%87%e0%a6%87-%e0%a6%b9%e0%a7%87%e0%a6%be%e0%a6%81%e0%a6%9a%e0%a6%9f-%e0%a6%96%e0%a7%87%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%a8-%e0%a6%86%e0%a6%87%e0%a6%adনারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে (নাসিক) প্রথমদিনই হোঁচট খেলেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। বৃহস্পতিবার মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সঙ্গে দলের একজন ছাড়া তেমন কেউ ছিলেন না।
সরকারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বী সঙ্গে থাকায় দলের স্থানীয় নেতারা প্রার্থীর সঙ্গ ত্যাগ করেন।
অপরদিকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান ফুলটিম নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেন। তার সঙ্গে জেলা-মহানগরের শীর্ষনেতা ও সাবেক সংসদ সদস্যরা ছিলেন। প্রধান দুই দলের মেয়রপ্রার্থীর সঙ্গে স্থানীয় দলীয় প্রভাবশালী নেতাদের থাকা-না থাকার দৃশ্য সাধারণ মানুষসহ দলীয় কর্মী-সমর্থকদের দৃষ্টি কেড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুই কারণে তৃণমূলের শীর্ষ ও মধ্যম সারির নেতাদের মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় আইভীর সঙ্গে দেখা যায়নি। দলীয় শীর্ষপর্যায়ের নেতারা মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়সূচি জানতেন না। জানার চেষ্টা করে তারা ব্যর্থ হয়েছেন।
এছাড়া আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে সন্ত্রাসের লালনকারী হিসেবে চিহ্নিত সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বী সঙ্গে থাকায় অন্যরা আগ্রহ প্রকাশ করেননি।
আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের শীর্ষপর্যায়ের প্রায় সব নেতাই মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় উপস্থিত থাকার জন্য প্রস্তুত হয়ে কেউ বাসায়, কেউ ২নং রেলগেট এলাকার দলীয় অফিস এবং কেউবা ক্লাবের আশপাশে অবস্থান করছিলেন। ক্লাবে অবস্থানরত কয়েকজন নেতা জানান, না ডাকলেও দলীয় প্রার্থীর মনোনয়নপত্র দাখিলকে সামনে রেখে তারা ছুটে আসেন। কিন্তু যখনই আওয়ামী লীগ এবং দলীয় প্রধানকে কটূক্তিকারীকে সঙ্গে দেখেছেন, তখনই তারা হতবাক হয়ে যান। যে এখনও ওয়ান-ইলেভেনের গ্রুপের ‘খপ্পর’ থেকে বের হতে পারেননি তার সঙ্গে কীভাবে কাজ করবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দলের নেতাকর্মীরা।
এ প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, আমি ভেবেছিলাম, আমার মেয়ে আইভী আমাকে সঙ্গে নিয়েই মনোনয়নপত্র জমা দিতে যাবে। আমরা সবাই প্রস্তুতও ছিলাম। কিন্তু সে একটিবারের জন্য আমাদের ফোন করেও যেতে বলেনি। নেতাকর্মীরা এতে কষ্ট পেলেও সবাই নৌকার জয় তথা আওয়ামী লীগের জয়ে সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করবে।
মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচন চলছিল। এর মধ্যেই আমরা সকাল থেকে প্রস্তুত ছিলাম নৌকার প্রার্থী আমাদের সেলিনা হায়াৎ আইভীর মনোনয়নপত্র জমা দিতে যাব। কিন্তু দুপুরে জানতে পারলাম, আইভী মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে দিয়েছেন এবং তিনি সেখানে বামপন্থী নেতা রফিউর রাব্বীকে নিয়ে গেছেন। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই গিয়েছেন, কিন্তু সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত বাদল সেটা জানেন না।
কয়েকজন আইনজীবী বলেন, বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আইনজীবী সমিতির নির্বাচন দেখতে যান স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। সেখানে দলের মহানগর, এবং জেলা ও বিভিন্ন উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীরা ছিলেন।
এ সময় তিনি নেতাকর্মীদের আইভীর সঙ্গে মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি শামীম ওসমান মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় জানতে আইভীকে দু’দফায় এসএমএস দেন। কিন্তু কোনো উত্তর পাননি।
বেলা সাড়ে ১২টার দিকে সেখানে থাকতেই শামীম ওসমানসহ অন্য নেতারা খবর পান দলীয়প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। তখন উপস্থিত নেতাকর্মীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন।
বিশেষ করে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ মোহাম্মদ বাদল, মহানগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা, সহসভাপতি চন্দনশীল, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি মুজিবুর রহমান, বন্দর থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি আবদুর রশীদ, ফতুল্লা থানা সভাপতি সাইফউল্লাহ বাদলসহ কয়েকজন ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এ সময় তারা শামীম ওসমানের কাছে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, তিনি (আইভী) আমাদের মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় ডাকেননি। আপনি (শামীম) সময় জানতে চেয়েও জানতে পারেননি। আপনি আমাদের আর কত অপমান করাবেন? আপনি আমাদের সম্মানিত করতে না পারেন, কিন্তু অপমান করাতে পারেন না।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শামীম ওসমান দু’বার এসএমএস পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করে যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি সকাল থেকেই অপেক্ষা করছিলাম। কোনো খোঁজখবর না পেয়ে বেলা ১১টা ১০ মিনিটের দিকে এসএমএস দিই। পরে ১২টার দিকে আরেকটি এসএমএস পাঠাই। কিন্তু কোনো এসএমএসের জবাব পাইনি। পরে সাড়ে ১২টার দিকে জানতে পারি- মনোনয়নপত্র জমা হয়ে গেছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আইভী আমার ছোট বোন। ও ডাকুক আর না ডাকুক, আমরা যতই অসম্মানিত হই না কেন, নেত্রীর সম্মানে কাজ করে যাব। আমাদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই।’
এ সময় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মঙ্গলবার রাতে অনুষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠককে সামনে রেখে কিছু গণমাধ্যম মনগড়া তথ্য দিয়ে মিথ্যাচার করছে। বিষয়টি আমি দলের সাধারণ সম্পাদককে জানিয়েছি। উনি বলেছেন, বিষয়টি তিনি দেখছেন।’
শামীম ওসমান আরও জানান, ‘আমাদের ধারণা, ওইসব মিডিয়া বিএনপি প্রার্থীকে জয়ী করাতে আওয়ামী লীগের বিভেদকে জিইয়ে রাখার চেষ্টা করছে। যদিও নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগে এখন আর বিবাদ নেই।’
মনোনয়নপত্র জমাদানের ভেন্যু স্থাপন করা হয় ঐতিহ্যবাহী নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে। সকাল থেকেই এই ভেন্যুর আশপাশে ছিল সাধারণ মানুষ ও দলীয় নেতাকর্মীদের ভিড়। বেলা সোয়া ১১টার দিকে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী কিছু নেতাকর্মীসহ মনোনয়নপত্র জমা দিতে আসেন। রিটার্নিং কর্মকর্তার অস্থায়ী দফতরে তিনি মুরব্বি হিসেবে ৫ জনকে সঙ্গে নেন।
তারা হলেন- জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক আবদুল হাই, সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল কায়সার, নারায়ণগঞ্জ সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বী, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আমিনুর রহমান ও শিল্পপতি মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রাশেদ রাশু।
মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পর ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী সাংবাদিকদের বলেন, নারায়ণগঞ্জ তৃণমূল আওয়ামী লীগের সবাই আমার সঙ্গে আছে। আপনারা দলীয় কার্যালয়ে গিয়ে দেখেন সেখানে অনেকেই আছেন। আচরণবিধি অনুযায়ী ৫ জনের বেশি নিয়ে আসা যাবে না। তাই সবাইকে নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। মুরব্বি হিসেবে ৫ জনকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি।
তিনি বলেন, আমি কখনও আওয়ামী লীগের বাইরে ছিলাম না। আইভী ও নৌকা বিচ্ছিন্ন নয়।
প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মহানগর আওয়ামী লীগ আমার পাশে নেই- সেটা বলা ঠিক হবে না। আমাদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। তিনি বলেন, আমি আশা করি আগামী ২২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর পক্ষেই নারায়ণগঞ্জবাসী গণরায় দেবেন।
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় আছে। আমি এই সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশেই নির্বাচন করতে চাই। এখনই সেনা মোতায়েনের কোনো প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি না। লাখো মানুষই আমার সেনাবাহিনী। আচরণবিধি লংঘন সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি কোনো আচরণবিধি লংঘন করিনি। আমি কথা দিচ্ছি আমি সব নিয়ম-কানুন মেনে চলব।’
আইভীর মনোনয়নপত্র দাখিলের প্রায় ৪০ মিনিট পর আসেন বিএনপি প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খান। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী মনিরুজ্জামান, সাবেক তিন সংসদ সদস্য মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন, আতাউর রহমান খান আঙ্গুর, অ্যাডভোকেট আবুল কালাম, নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল, বন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুল, জেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আবু আলী ইউসুফ খান টিপুসহ অনেকে।
এ সময় সাংবাদিকদের বিএনপি প্রার্থী বলেন, গণতন্ত্র রক্ষায় প্রয়োজনে রক্ত দিয়ে হলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী লড়াইয়ে মাঠে থাকব। গণতন্ত্র রক্ষায় প্রয়োজনে রক্ত দেব।
তিনি বলেন, ধানের শীষ গণতন্ত্রের প্রতীক। আর নৌকা গণতন্ত্র হরণের প্রতীক। নৌকা নয়, মানুষের আস্থা এখন ধানের শীষে। মানুষের ভোটাধিকার রক্ষার জন্য ধানের শীষ কাজ করে যাচ্ছে। এই নির্বাচনে ধানের শীষের সমর্থকদের ভোট দেয়ার অধিকার সৃষ্টি হয়েছে। এখন দেখার পালা ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার সুষ্ঠু পরিবেশে প্রয়োগ করতে পারেন কিনা।
তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নিরপেক্ষ প্রশাসন প্রয়োজন। প্রশাসনে অনেক দলবাজ কর্মকর্তা আছে। তাদের বদলি করতে হবে। আমাদের যেন হাত-পা বেঁধে ফেলা না হয়। লেভেল প্লেয়িং কন্ডিশন বজায় রাখা দরকার। আমরা প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন চাই। অবৈধ অস্ত্রের পাশাপাশি বৈধ অস্ত্র জমা দিতে হবে। এ এলাকায় অনেক বৈধ অস্ত্র আছে। তা দিয়ে প্রভাবশালীরা নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই তারা যেন দাপট দেখাতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি। জনগণ আমাকে পাশে পেয়েছে। তাই জনগণ আমাকে ভোট দেবে। আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করতে নির্বাচন কমিশন সরকারের কাছে সেনাবাহিনী চেয়েও পায়নি। সেজন্য আমরা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াই। এবারও সেনাবাহিনী চেয়েছি। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী ও দুর্বৃত্তদের গ্রেফতারে দাবি জানিয়েছি।
তিনি নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশে বলেন, দু’দলকে সমান সুযোগ দিতে হবে। আইনশৃংখলা পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। বিএনপি নেতাকর্মীদের কোনোরকম হয়রানি বা হুমকি, হামলা ও মামলা করে হয়রানি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। যেন কর্মীরা সঠিকভাবে মাঠে নির্বাচনী কাজ করতে পারে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 81 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ