সবজি ও ফল উৎপাদনে দেশের সেরা টাঙ্গাইল

Print

%e0%a6%b8%e0%a6%ac%e0%a6%9c%e0%a6%bf-%e0%a6%93-%e0%a6%ab%e0%a6%b2-%e0%a6%89%e0%a7%8e%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a6%a8%e0%a7%87-%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a7%87গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার প্রায় মধ্যভাগে অবস্থান টাঙ্গাইল জেলার। বৈচিত্র্যময়, বিচ্ছিন্ন আর সঙ্গতিচ্যুত ভূপ্রকৃতি হলো এ জেলার বৈশিষ্ট্য। বন-বাদাড়, টিলা-উপত্যকা, অগভীর খাদ ও ঢেউ খেলানো ভূপ্রকৃতি একে করে তুলেছে অনন্য। তাই টাঙ্গাইল জেলা শুধু একঘেয়ে প্রান্তর বা ঊর্ধ্ব সমতল ভূমিই নয়, একের পর এক বিস্তৃত রয়েছে বৃক্ষাচ্ছাদিত অসংখ্য প্রান্তর।
ব্রহ্মপুত্রের স্রোতবাহী যমুনার পলি দ্বারা গঠিত জেলার সমভূমির প্রধান ফসল ছিল ধান। এখন সবজিরও বড় জোগানদাতা টাঙ্গাইল। আর আনারস উত্পাদনে বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে জেলার মধুপুর অঞ্চল। দেশের আনারসের চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি আসছে এখান থেকে। সাফল্য এসেছে কলা, কাঁঠাল, আমের মতো ফল উৎপাদনেও। সব মিলিয়ে সবজি ও ফল উৎপাদনে দেশের সেরা জেলা এখন টাঙ্গাইল।

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলায় ব্যাপক ভিত্তিতে আনারসের চাষ শুরু হয় আশির দশকে। ওই সময় ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে কয়েকটি আনারসের চারা এনে বাগান করেন মধুপুর উপজেলার ইদিলপুর গ্রামের জন বেরুনা চিসিম। তিন বছর পর এলাকার আরো অনেকেই তার কাছ থেকে চারা নিয়ে আনারস উৎপাদন শুরু করেন। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে পুরো মধুপুরেই ছড়িয়ে পড়ে আনারস আবাদ। এখন তা রূপ পেয়েছে বাণিজ্যিক চাষে। দেশে উৎপাদিত আনারসের সিংহভাগই আসছে টাঙ্গাইল থেকে।
জেলায় ব্যাপকভিত্তিক আবাদের কারণে গড়ে উঠেছে আনারসচাষীদের সমিতি। মধুপুর আনারসচাষী সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন মো. আলী আকবর। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আনারস উৎপাদনে মধুপুরে বিপ্লব ঘটে গেছে। কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন বিধায় অন্যদের মধ্যেও আনারস চাষে আগ্রহ বাড়ছে। বিপণন ব্যবস্থাপনা উন্নত করা গেলে আরো লাভবান হতেন কৃষক।
আনারসের পাশাপাশি অন্যান্য ফলেরও গুরুত্বপূর্ণ উত্স টাঙ্গাইল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে উৎপাদিত কলার প্রায় ১৩ শতাংশ আসছে জেলাটি থেকে। কাঁঠালেরও প্রায় ৫ শতাংশ জোগান দিচ্ছে টাঙ্গাইল। এছাড়া আমের ২ শতাংশ, পেঁপের ৩ শতাংশ, লিচুর ২ শতাংশ ও পেয়ারার প্রায় ২ শতাংশ উৎপাদন হচ্ছে জেলাটিতে। আর আনারসের প্রায় ৬০ শতাংশই উৎপাদন হচ্ছে এ জেলায়।
ফলের পাশাপাশি সবজি উত্পাদনেও সাফল্য পেয়েছেন জেলার কৃষকরা। শীত ও গ্রীষ্মকালীন— দুই ধরনের সবজিই উৎপাদন হচ্ছে জেলাটিতে। শীতকালীন সবজির প্রায় সবই উৎপাদন করছেন এ জেলার কৃষকরা। বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, দেশে উৎপাদিত ফুলকপির প্রায় ১০ ও বাঁধাকপির ৯ শতাংশ আসছে এখান থেকে। এছাড়া লাউয়ের ৭ দশমিক ৫, বেগুনের ৬, মুলার ৫ ও কুমড়ার ৫ শতাংশ উৎপাদন হচ্ছে টাঙ্গাইলে। অন্যান্য শীতকালীন সবজিরও প্রায় ৭ শতাংশ জোগান দিচ্ছে জেলাটি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আবহাওয়াগত সুবিধা, মাটির উর্বরা শক্তি ও কৃষকের আগ্রহের কারণেই জেলায় ফল ও সবজি উৎপাদন বেড়েছে। পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় খুব সহজেই উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে পারছেন কৃষক। পণ্য বিক্রি করে ভালো লাভও পাচ্ছেন তারা, যা তাদের ফল ও সবজি আবাদে আরো আগ্রহী করে তুলছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মহাপরিচালক হামিদুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, টাঙ্গাইল জেলার ভূপ্রকৃতি ফল উৎপাদনের জন্য সহায়ক। অধিক মুনাফা দিতে একই জমিতে কলা, পেঁপে ও আনারস আবাদের কৌশল সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। আর বন্যামুক্ত ও উচ্চফলনশীল জাত সম্প্রসারণের কারণে সবজি আবাদ জনপ্রিয় হচ্ছে। কৃষকরা ঝুঁকিমুক্তভাবে বিভিন্ন সবজি আবাদে আগ্রহী হচ্ছেন। এছাড়া জেলাটিতে সবজি রফতানির হাব বানানোরও পরিকল্পনা করা হয়েছে।
জানা গেছে, জেলাটি গ্রীষ্মকালীন সবজির মধ্যে ডাঁটা, কাঁকরোল, কচু, ধুন্দল ও ঝিঙা উৎপাদনে বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। দেশের প্রায় আড়াই লাখ টন কচুর ১০ শতাংশ, সাড়ে ১৫ হাজার টন ধুন্দলের ৯ শতাংশ ও ৬৯ হাজার টন ডাঁটার প্রায় ৯ শতাংশ জেলাটিতে উৎপাদন হচ্ছে। এছাড়া ঢেঁড়সের ৬ ও চালকুমড়ার ৫ শতাংশ টাঙ্গাইলে উৎপাদন হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন কুমড়া, বেগুন, কলা ও করলার প্রায় ৩ শতাংশ এবং পটোলের প্রায় ২ শতাংশ উত্পাদন হচ্ছে এ জেলায়।
বিপণন সুবিধা এ অঞ্চলে ফল ও সবজি আবাদে কৃষককে আগ্রহী করছে জানিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, মাটির গঠন, উপকরণ সহায়তা, পানির প্রাপ্যতা ও সার্বিক পরিবেশ সুবিধার কারণে জেলাটি ফল ও সবজি উৎপাদনের জন্য এককভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি আঞ্চলিকতা ও জমির কন্ডিশন অনুসারেই ফসল আবাদে কৃষককে উৎপাহিত করছেন সম্প্রসারণকর্মীরা। শস্য বহুমুখীকরণের মাধ্যমে জমির সর্বোচ্চ গুণগত মান ধরে রাখতে আরো সচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
ধান আবাদে মুনাফা না হওয়ার কারণেই মূলত কৃষক সবজি আবাদে আগ্রহী হচ্ছেন বলে মনে করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বিভাগের সাবেক ডিন প্রফেসর ড. আবদুল খালেক। তিনি বলেন, দেশের বীজ কোম্পানি ও সরকারি প্রচেষ্টার মাধ্যমে বীজ ও অন্যান্য উপকরণ সহজলভ্য হচ্ছে। রফতানির সুযোগ ও বাজার সংযোগের কারণে কৃষকরা ভালো মুনাফাও পাচ্ছেন। এতে কৃষক আরো বেশি উৎসাহিত হচ্ছেন।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 72 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ