‘সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছি ইসলামে’

Print
সূরা আন আম ৮৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘এটি আল্লাহর হেদায়েত। তিনি এর মাধ্যমে তার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা সঠিক পথ দেখান।’
ইসলাম অনুশীলনের সাথে প্রগতি, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা, জীবনে উন্নতি, নারী স্বাধীনতা ইত্যাদি সাংঘর্ষিক – এমন ভ্রান্ত ধারণা প্রায়ই শোনা যায়। বাস্তবে কোনো ধর্মই অশান্তির কথা বলে না। ধর্ম চায় মানুষ সামাজিক নিয়মের মধ্যে থেকে স্রষ্টাকে মেনে চলুক। কিন্তু নিজের এবং স্ব-গোষ্ঠীর হীন স্বার্থ পূরণের জন্য ধর্ম অপব্যবহার হয়ে আসছে, যুগে যুগে– এখনো। কলুষিত হচ্ছে ধর্ম।
সূরা আন আম ৮৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘এটি আল্লাহর হেদায়েত। তিনি এর মাধ্যমে তার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা সঠিক পথ দেখান।’
আজকে আপনাদের এমন একজন ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব যিনি পাশ্চাত্যের চাকচিক্যময় পপ জগত ছেড়ে খৃস্ট ধর্ম বদলে শান্তির ধর্ম ইসলামের ছায়াতলে নিজের আশ্রয় খুঁজে নিয়েছেন। তাই প্রতিপদে তাকে মুখোমুখি হতে হচ্ছে নানা প্রতিকূলতার। তবু তার জনপ্রিয়তা কমে নি একদমই। চালিয়ে যাচ্ছেন ইসলামের সৌন্দর্য প্রচারে নিরলস কর্মযজ্ঞ।
তার নাম ইউসুফ ইসলাম। ২১ জুলাই ১৯৪৮ সালে ইংল্যান্ডে জন্ম নেয়া এই ব্যক্তির জন্ম সূত্রে নাম ছিল ক্যাট স্টিভেন্স। ইউসুফ ইসলাম একাধারে মানবতাবাদী, শিক্ষাগুরু, গায়ক, গীতিকার, মাল্টি ইনস্ট্রুমেন্টালিস্টস। ইউসুফ ইসলামের জীবনী পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সঠিকভাবে ধর্ম-কর্ম পালন করেও সফল, পরোপকারী, আধুনিক মানুষ হিসেবে নিজেকে বদলে নেয়া যায়।
আধাঁর থেকে আলোর পথে: ১৯৭৬ সালের ছোট একটি দূর্ঘটনা বদলে দেয় তার সারাটা জীবন। ঘটনার দিন আমেরিকার ম্যালিবু বিচে সাতার কাটতে যেয়ে প্রায় ডুবতে বসেছিল। তখন সে মৃত্যু ভয়ে চিৎকার করে উঠে, ‘Oh God!If you save me I will work for you.’ বলতে না বলতেই অপ্রত্যাশিত উল্টো একটি ঢেউ তাকে তীরে আছড়ে ফেলে! এই ঘটনার পর থেকে ক্যাট স্টিভেন্সের মনে আমূল পরিবর্তন আসে। পাশ্চাত্যের জড়বাদী জগতের পিছনে না দৌড়ে মনের শান্তি এবং আধ্যাত্মিক সত্যানুসন্ধানের দিকে ঝুঁকে পরেন। শুরুতে বৌদ্ধ ধর্ম, জেন, রাশিফল, অ্যাস্ট্রলজি, নিউমারলজি, টেরট কার্ড ইত্যাদি তুলনামুলক বোঝার চেষ্টা শুরু করেন।
স্টিভেন্সের ভাই ডেভিড গর্ডন জেরুজালেম ঘুরতে যেয়ে ভাইয়ের জন্য একটি পবিত্র কুরআন নিয়ে এসেছিলেন। ধারণা করা হয়, এই সময় থেকেই ক্যাট স্টিভেন্সের মধ্যে ইসলামকে জানার আগ্রহ তৈরি হয়। এমন সময় ছুটিতে স্টিভেনস মরোক্কো ঘুরতে যেয়ে প্রথম আজানের ধ্বনি শুনতে পেয়ে অভিভূত হয়ে পড়েন। জানতে চান, ‘এটা কিসের শব্দ?’ উত্তরে জানতে পারেন, ‘এটা আজান, আসমানি বার্তা। যার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকতে মুসলমানদের মসজিদ মুখে আহ্বান করা হয়।’
স্টিভেন্স ভাবেন, জীবনে টাকার জন্য গান করতে শুনেছি, গান হয়েছে খ্যাতির জন্য.. ক্ষমতা.. কিন্তু আধ্যাত্মিক গান? জীবনেও শুনিনি! অসাধারণ কনসেপ্ট! বলা যায় এই ভ্রমণটি ছিল ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পথে তার শেষ পদক্ষেপ। পবিত্র কুরআন পড়ে ক্যাট স্টিভেন্স এত অভিভূত হন যে, তিনি ইসলাম সম্পর্কে সার্বিক গবেষণা ও পড়াশুনা করার সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘পবিত্র কুরআনের যে দিকটি সব কিছুর আগে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল তা হলো এ মহাগ্রন্থের কভারের ওপর লেখকের কোনো নাম ছিল না। এ উপহার ছিল এমনই মূল্যবান সম্পদ যে তা আমার জীবনকে বদলে দিয়েছে।
যাই হোক, শুরু করলাম কুরআন অধ্যয়ন। যতবারই এ মহাগ্রন্থ পড়তাম ততবারই প্রশান্তি অনুভব করতাম। মনে হতো এ কুরআন যেন আমার
জন্যই লেখা হয়েছে, তাই বার বার পড়েও তৃষ্ণা মিটত না। পবিত্র কুরআন পড়ে বুঝতে পারলাম, ইসলামই হলো সেই ধর্ম যার সন্ধান আমি করছিলাম। কারণ, আমার মনের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছি এ মহান ধর্মে।
পবিত্র কুরআন আমার ওপর প্রভাব ফেলেছে কল্পনার চেয়েও অনেক গুণ বেশি। আমি বুঝতে পারলাম যে কুরআনের শাশ্বত বাণী নাযিল হয়েছে গোটা মানবজাতির চিরন্তন সৌভাগ্যের জন্যই। এ মহাগ্রন্থের বাণী খুবই সহজ ও স্পষ্ট। কুরআনের শব্দগুলো আমাকে খুবই বিস্মিত করে। এ পর্যন্ত জীবনে যত বই পড়েছি তার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা বা ব্যতিক্রমধর্মী লেগেছে এ মহাগ্রন্থ।
পবিত্র কুরআন পড়ার আগে পার্থিব জীবনকে আমার কাছে এক দুর্বোধ্য রহস্য বা ধাঁধা বলে মনে হত। এ বিশ্ব জগতের যে একজন স্রস্টা রয়েছেন তা বিশ্বাস করতাম। কিন্তু জানতাম না এই যে স্রষ্টা যাকে চোখে দেখা সম্ভব নয় তিনি কে? এটা জানার জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু কোনও ফল পাই নি। ঠিক যেন এমন এক নৌকার অবস্থায় ছিলাম যা উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিল না। কিন্তু যখন পবিত্র কুরআন অধ্যয়ন করলাম তখন অনুভব করলাম যে এ বই যেন আমার সঙ্গে কথা বলছে। এভাবে এ মহাগ্রন্থের বাণীর মধ্যে পুরোপুরি ডুবে পড়েছিলাম।
পবিত্র কুরআন অধ্যয়নের পর ধীরে ধীরে ইসলামী মূল্যবোধগুলোকে নিজ জীবনের ওপর প্রয়োগ করছিলেন ক্যাট স্টিভেন্স। মশগুল হতে থাকেন আল্লাহর ইবাদতে। মদ, ক্লাব ও পার্টি—এসব অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলছিলেন। অবশেষে গ্রহণ করেন পবিত্র ইসলাম ধর্ম। এভাবে ক্যাট স্টিভেন্স পরিণত হন ইউসুফ ইসলামে।
ইউসুফ নামটি যোসেফ নামের আরবি রূপ। এই নামটি বেছে নেয়া প্রসঙ্গে সাবেক ক্যাট স্টিভেন্স বা নও-মুসলিম ইউসুফ ইসলাম বলেছেন, আমি সব সময়ই যোসেফ নামটি পছন্দ করতাম। যে স্কুলে আমি প্রথম ভর্তি হই ও পড়াশুনা করেছিলাম সেই স্কুলটির নাম ছিল সেন্ট যোসেফ। অবশ্য এই নাম বেছে নেয়ার মূল কারণটি হল কুরআনের সুরা ইউসুফ অধ্যয়ন। এই সুরা দারুণভাবে নাড়া দিয়েছে আমার মনকে।
ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর ইউসুফ ইসলাম মুসলমানদের প্রথম কিবলা অধ্যুষিত বায়তুল মুকাদ্দাস শহর সফর করেন। এই পবিত্র শহর সফরের কারণ তুলে ধরে তিনি বলেছেন, এই পবিত্র স্থানে আমার ভাইয়ের জিয়ারতের সুবাদেই আমি সু-পথ তথা ঈমানের সম্পদ পেয়েছি। মসজিদুল আকসা জিয়ারতের সময় যারা আমাকে নও-মুসলিম হিসেবে শনাক্ত করে ফেলে তারা আমার চার দিকে জড় হয়। আমি এই মসজিদে নামাজ পড়লাম ও অনেক কাঁদলাম। হায় আলকুদস! এ পবিত্র স্থান মুসলিম বিশ্বের হৃৎপিণ্ড। যতদিন এ হৃৎপিণ্ড অসুস্থ থাকবে ততদিন গোটা মুসলিম বিশ্বই অসুস্থ থাকবে। এই মসজিদুল আকসাকে দখল মুক্ত করা আমাদেরই দায়িত্ব। আমার দৃঢ় বিশ্বাস জাতিগুলো যদি কুরআন ও এর শিক্ষার আলোকে চলে তাহলে কুদস মুক্ত হবে। আসলে ফিলিস্তিন সংকট কেবল ফিলিস্তিনি জাতির সংকট নয়। বরং গোটা মুসলিম বিশ্ব এই সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সাবেক পপ তারকা ইউসুফ ইসলাম বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-কে নিয়ে সঙ্গীতের একটি অ্যালবাম রচনা করেছেন। তার কাছে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদকে (সা.) সব সময়ই শান্তির প্রতীক বা আদর্শ বলে মনে হয়। নও-মুসলিম ইউসুফ ইসলাম মনে করেন ইসলাম এমন এক ধর্ম যা অন্য সব ধর্মের কাছেও শান্তি ও সমঝোতার প্রচার-প্রসার ঘটাচ্ছে।
তিনি এখন ইসলামী জীবনের লক্ষ্য অর্জনের জন্য কঠোর প্রয়াস চালাচ্ছেন। মুসলমান হওয়ার পর কিছু দিন গান গাওয়া ও রেকর্ড করা ছেড়ে দিয়েছিলেন। বিয়ে করার পর তিনি ব্রিটিশ মুসলিম সমাজের সেবায় নিয়োজিত হয়েছেন। পপ তারকা হিসেবে তার বার্ষিক আয় ছিল দেড় মিলিয়ন ডলার। তার জমানো সেইসব অর্থ ও ভবিষ্যৎ আয়কে লন্ডন ও অন্যান্য অঞ্চলের মুসলমানদের শিক্ষার কাজে ও অন্যান্য দাতব্য খাতে ব্যয় করার পদক্ষেপ নিয়েছেন। মানব-দরদি শান্তি মিশন নিয়েও দেশে দেশে সফর করছেন সাবেক ক্যাট স্টিভেন্স। পৃথিবীর উত্তর থেকে দক্ষিণে এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে বিস্তৃত হয়েছে তার সফর।
এটা সত্য মুসলমান হওয়ার কারণে পাশ্চাত্যের শীর্ষস্থানীয় পপ তারকার পদটি এখন আর তার দখলে নেই, কিন্তু যা তিনি পেয়েছেন তা হলো সবচেয়ে বড় সম্পদ তথা ঈমান ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তি।
 
ইসলাম ধর্ম প্রচারে অবদান : বর্তমানে ইংল্যান্ডে মুসলিম কমিউনিটিতে ইউসুফ ইসলাম জনপ্রিয় একজন ব্যক্তিত্ব। মূলত তিনটি মৌলিক ক্ষেত্রে তিনি নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।
১. শিশুদের ইসলাম শিক্ষা ২. ইসলামের দাওয়াত ৩. বিশ্বের সুবিধা বঞ্চিত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো
 
আমেরিকায় অনুপ্রবেশে বাধা: ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে রেকর্ডিংয়ের কাজে লন্ডন থেকে ওয়াশিংটনে যাবার পথে তাকে আটক করা হয়। অভিযোগ আমেরিকার Border Protection(CBP) এ No Fly List-এ তার নাম আছে। সে কারনে তাকে ইংল্যান্ডে ফিরে আসতে হয়। এ বিষয়ে আমেরিকার Homeland Security-এর এক মুখপাত্র দাবি করে, ‘নানা ঘটনা বিষয় পর্যালোচনা করে দেখা গেছে তাকে দিয়ে সম্ভাব্য ‘টেরোরিস্ট’ সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে! তাই এই ব্যবস্থা।’
২০০০ সালে ইসরাইলি সরকারও তাকে ইসরাইলে ঢুকতে দেয়নি। অভিযোগ প্যালেস্টাইনি সংস্থা ‘হামাস’কে সাহায্য করার। ইউসুফ ইসলাম সব সময়ই এই সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আমার সবাই জানি পবিত্র নগরী প্যালেস্টাইনে কী হচ্ছে এবং তাদের সত্যি অনেক সাহায্য প্রয়োজন। যেকোনো ‘রাষ্ট্রকে অর্থ সাহায্য’ করাকে অনেকেই রাজনৈতিক রঙ লাগিয়ে তাদের হীন স্বার্থ হাসিল করার চেষ্টা করে। পরে ইউসুফ ইসলাম এই বিষয়টি নিয়ে Paul McCartney, Alison Krauss, Dolly Parton এবং Terry Sylvester সাথে নিয়ে Boots and Sand নামের একটি গান লিখেন।
 
পশ্চিমা মিডিয়ার আক্রমণ : ২০০৪ সালের অক্টোবরে ইংল্যান্ডের নামকরা পত্রিকা ‘The Sun’ এবং ‘The Sunday Times’ তাদের বিভিন্ন রিপোর্টে বলতে থাকে ইউসুফ ইসলামকে আমেরিকা থেকে ফেরত পাঠানো সঠিক ছিল। এবং তারা দাবি করে, ইউসুফ ইসলামের সাথে সন্ত্রাসী গ্রুপের যোগসাজস আছে। এ কারণে ইউসুফ ইসলাম পত্রিকাগুলোর বিরুদ্ধে কোর্টে মামলা করে দেন। এবং সফলতার সাথে কোর্টের বাইরে সমঝোতার মাধ্যমে পত্রিকার কাছে থেকে অর্থ দন্ড পান এবং পত্রিকাগুলো তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। যদিও ‘The Sun’-এর সম্পাদক দাবি তাদের প্রতি অবিচার করা হয়েছে!
ইউসুফ ইসলামের ভাষ্য, ‘এখন বর্তমান বিশ্বে খুবই সহজেই যেকোনও মুসলিমকে প্রমাণ ছাড়া হাস্যকরভাবে দোষী বলা যায়! আমার বেলায় এইরকম মিথ্যা বানোয়াট খবর সরাসরি আমার পরিচালিত রিলিফ কার্যক্রম এবং আর্টিস্ট হিসাবে আমার সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। অনেক সময় এই রকম অসুস্থ আঘাতের ক্ষতিপূরণ হয় না। মিথ্যা একবার প্রচার হলে সবাইকে সত্যটা জানানো বেশ কঠিন।’
যাহোক, ক্ষতিপূরণ হিসাবে কোর্ট থেকে প্রাপ্ত সকল অর্থ সে সময়ে ভারত মহাসাগরের ঘটে যাওয়া সুনামিতে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যর্থে দান করে দেন।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 37 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ