সমন্বিত পরীক্ষার পদ্ধতির ভালো-মন্দ

Print
দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ভর্তি পরীক্ষা দিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ছবিটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার পর তোলা। ছবি: সৌরভ দাশসম্প্রতি রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমাতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা চালু করার আহ্বান জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে শিক্ষার্থীরা কী ভাবছেন? দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মতামতঃ

মাত্র একবারই সুযোগ!

সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার যেমন ভালো দিক আছে, খারাপ দিকও আছে। একেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে একেক রকম প্রশ্ন হয়। নিজস্ব বাছাইপদ্ধতির মাধ্যমেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থী ভর্তি করে। আর সব শিক্ষার্থী যে এক-দেড় ঘণ্টার মাত্র একটা পরীক্ষায় নিজের সেরাটা দিতে পারবে, তা তো না। সমন্বিত পরীক্ষা হলে একজন শিক্ষার্থী আর দ্বিতীয় কোনো সুযোগ পাবে না। আমাদের একটু কষ্ট হয়, খরচ হয় সেটা ঠিক। তবু আমার কাছে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার ‘আইডিয়া’ খুব একটা ভালো বলে মনে হচ্ছে না।
ঈশানী চৌধুরী
ভর্তি পরীক্ষার্থী, রংপুর সরকারি কলেজ, রংপুর

পুরো শহরে থাকার মতো হোটেল পাইনি
আমি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার পক্ষে। একটা ঘটনা বলি। যখন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে গেলাম, পুরো শহর খুঁজেও থাকার মতো হোটেল পাইনি। পরে অন্য একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হোস্টেলে ছিলাম। আমি আর আমার বন্ধুর যে বড় ভাইয়ের রুমে ছিলাম, তিনি ঘুমানোর জন্য একটা বালিশও দেননি। রুমের ভেতর সারা রাত সিগারেট খেয়েছেন। খুবই অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়েছি। পরীক্ষার আগের রাতে এমন পরিবেশ কার ভালো লাগে? যাতায়াতের অসুবিধা তো আছেই।
কামরুল হাসান
ভর্তি পরীক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজ, চট্টগ্রাম

এতটুকু কষ্ট স্বীকার করে নেওয়াই যায়
এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ঘুরে ঘুরে পরীক্ষা দিতে গেলে যাতায়াত, থাকার ব্যবস্থা নিয়ে কষ্ট তো হয়ই। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, একটা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পছন্দের বিষয়ে পড়ার জন্য এতটুকু কষ্ট স্বীকার করে নেওয়াই যায়। এতে করে এক শিক্ষাবর্ষের শেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা পর্যন্ত আমাদের চেষ্টা অব্যাহত থাকে। ‘চান্স’ পাওয়ার সুযোগ থাকে। সমন্বিত পরীক্ষা হলে এক নিমেষেই সেটা শেষ হয়ে যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে আবেদন ফরমের মূল্য ও ইউনিটের সংখ্যা কম হলে ভালো হতো।
অনামিকা দেবনাথ
ভর্তি পরীক্ষার্থী, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর

চালু হওয়ার আগে গবেষণা প্রয়োজন
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাগুলো আলাদাভাবে অনুষ্ঠিত হলে যেসব সমস্যায় পড়তে হয়, সেসব বিষয়ের মধ্যে প্রধান কয়েকটি হচ্ছে—১. অনেক সময় একই দিনে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা থাকে। যেকোনো একটা বেছে নিতে হয়। ২. দূরে যাতায়াতের ফলে ক্লান্তিকর ভ্রমণ এবং থাকার সমস্যা ফলে অনেক সময় ভালো প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষা খারাপ হয়। ৩. প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদাভাবে ফরম কেনার সামর্থ্য সবার থাকে না। আমি মনে করি, কয়েকটা নিয়ম করলে শিক্ষার্থীদের কষ্ট কমবে। যেমন সবগুলো প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, সবগুলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সবগুলো কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা একসঙ্গে হতে পারে। তবে হঠাৎ এই পদ্ধতি চালু না করে আগে আরও গবেষণা করা উচিত।
সামিহা আফিফা
ভর্তি পরীক্ষার্থী, শেরপুর সরকারি কলেজ, শেরপুর

সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সব বিষয় থাকে না
‘ক্লাস্টার সিস্টেমে’ ভর্তি পরীক্ষা হলে বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেবে। সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সব বিষয় থাকে না। ফলে শিক্ষার্থীরা পছন্দমতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পছন্দমতো বিষয়ে পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।
জেইন ইয়ালমায়ী
স্নাতকোত্তর, সমাজকর্ম বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

পরীক্ষাপদ্ধতিতে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হবে
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা সমন্বিত পদ্ধতিতে হওয়া অবশ্যই জরুরি। অনেক আগে থেকেই এটা চালু করা উচিত ছিল। এখনকার নিয়মে সময়, টাকা ও শ্রম অযথা খরচ হয়। অনেক সময় একই দিনে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা হওয়ায় সব পরীক্ষায় অংশও নিতে পারে না সবাই। তার ওপর, একেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন একেক রকম, তাই বারবার নতুন করে প্রস্তুতি নিতে হয়। তবে হ্যাঁ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিষয় বৈচিত্র্য আছে। তাই পরীক্ষা নেওয়া এবং প্রশ্নপত্র তৈরি করার ক্ষেত্রে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হবে।
তাসনিম আবেদীন
তৃতীয় বর্ষ, রসায়ন বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

রাষ্ট্রপতি নির্দেশ দিলে সবাই মানতে বাধ্য
আবদুল মান্নান
চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)
২ নভেম্বর ইউজিসি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য উপস্থিত ছিলেন। সেখানে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমাতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা চালু করতে উপাচার্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। পরে ১৪ নভেম্বর ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিনেও তিনি একই বক্তব্য দিয়েছেন। এ নিয়ে রাষ্ট্রপতি উপাচার্যদের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত, তাই সমন্বিত পরীক্ষার সিদ্ধান্ত তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। তবে রাষ্ট্রপতি নির্দেশ দিলে সবাই মানতে বাধ্য। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা চালু করা উচিত।

মানসিক চাপ কমবে
একটাই ভর্তি পরীক্ষা হলে কিন্তু পরীক্ষার্থীর সংখ্যা খুব বেশি বাড়ছে না; বরং সিটের সংখ্যা অনেক বাড়ছে। একজন পরীক্ষার্থী এখন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র কয়েক শ সিটের জন্য পরীক্ষা দেয়। প্রায় সেই পরিমাণ পরীক্ষার্থীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে যখন সে বেশিসংখ্যক সিটের জন্য পরীক্ষা দেবে, তখন তার ওপর মানসিক চাপ কম পড়বে। আবার ভর্তি পরীক্ষা শেষ করে ক্লাস শুরু করতে করতে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্চ-এপ্রিল মাস লেগে যায়। সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা হলে অনেক আগে ক্লাস শুরু করা যাবে। এতে সেশনজট কমবে। ‘একাডেমিক ক্যালেন্ডার’ অনেক বেশি এগিয়ে যাবে।
আশরাফুল আলম
প্রথম বর্ষ, ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

দুই ভাগে ভাগ করা উচিৎ
নিঃসন্দেহ সমন্বিত পরীক্ষা একটা ভালো উদ্যোগ হতে পারে। তবে কিছু বিষয় বিবেচনার প্রয়োজন আছে। আমার মনে হয় সমন্বিত পদ্ধতির পরীক্ষা দুই ভাগে ভাগ করে নেওয়া উচিত। ১. প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ২. পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। এভাবে করলে ছাত্রছাত্রীদের জন্য ব্যাপারটি সবচেয়ে বেশি জুতসই হয়। একটায় না টিকলে আরেকবার চেষ্টা করার সুযোগ থাকবে। ভর্তি-ইচ্ছুকদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সময়টা। তাই এ সময় তাদের অহেতুক শারীরিক ও মানসিক চাপ নেওয়া থেকে বিরত রাখা গেলেই ভালো। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছোটাছুটি করে পরীক্ষা দেওয়াটা খুব ক্লান্তিকর, ঝুঁকিপূর্ণ আর ব্যয়সাধ্যও বটে।
ইফফাত ইয়াসমিন
তৃতীয় বর্ষ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ক্রম কীভাবে হবে?
আমার কাছে সমন্বিত পরীক্ষার যেটা প্রধান সমস্যা মনে হয় সেটা হলো ভর্তি পরীক্ষার সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ‘র্যাং ক’ বা ক্রম তৈরি হবে কীভাবে? আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রম থাকলেও সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিষয়ের মান সমান নয়। যেমন আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য আর নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ আমার মতে দেশের সেরা। যারা স্থাপত্য বিষয়ে পড়তে চায়, ভালো রেজাল্ট করলে তাদের পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয় কীভাবে নির্বাচিত হবে? যদি এসবের সঠিক সমাধান করা সম্ভব হয়, তাহলে আমার ধারণা, এটা অনেক ভালো একটা উদ্যোগ হবে।
আরশাদ হোসেন
দ্বিতীয় বর্ষ, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

মেডিকেলে সমস্যা হয়নি
আমি যখন ভর্তি পরীক্ষা দিই, তখন হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা ইউনিটের পরীক্ষা আর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা একই দিনে পড়ে যায়। তাই আমাকে প্রথমে দিনাজপুরে একটা ইউনিটের পরীক্ষা দিয়ে তাড়াহুড়ো করে ময়মনসিংহে যেতে হয়েছিল। মেডিকেলের ক্ষেত্রে এ সমস্যা হয়নি। একটাই পরীক্ষা দিয়েছি। খুব সুবিধা হয়েছে।
শর্মিষ্ঠা ব্যানার্জি, দ্বিতীয় বর্ষ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ
গ্রন্থনা: সাহিব নিহাল

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 61 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ