সরকারি কেনাকাটায় বাড়ছে জালিয়াতি

Print

%e0%a6%b8%e0%a6%b0%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%bf-%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%9f%e0%a6%be%e0%a7%9f-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a7%9c%e0%a6%9b%e0%a7%87-%e0%a6%9cবিশ্বব্যাংকের ঋণে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে দক্ষতা এবং প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর। প্রকল্পের তিনটি প্যাকেজে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার কাজ পায় ডিসেন্ট ট্রেডিং নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
কার্যাদেশ দেওয়ার আগে ঠিকাদারের জমা দেওয়া কাগজপত্র নিয়ে সন্দেহ হয়। তদন্ত করে দেখা যায়, গ্যারান্টি হিসেবে জমা দেওয়া ব্যাংকের চেকটি জাল। অন্যান্য কাগজের মধ্যে আরো কিছু সনদও জাল।
এ কারণে ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে তিন বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজে এ প্রতিষ্ঠান আর অংশই নিতে পারবে না।
রবিবার দৈনিক সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনটি হুবহু তুলে ধরা হলো।
সরকারি কেনাকাটায় এ রকম জালিয়াতির ঘটনা বেড়েই চলেছে। একশ্রেণির সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে ব্যাংক গ্যারান্টি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের জাল সনদ ও ভুয়া কাগজ তৈরি করে জমা দিচ্ছেন ঠিকাদাররা। ফলে কারিগরি মূল্যায়নে অযোগ্য প্রতিষ্ঠান কাজ পাচ্ছে। জালিয়াতির বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা তদন্তে বেরিয়ে এলেও বেশিরভাগ থাকছে অজানা।
অভিযোগে প্রকাশ, মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে কাজ পাওয়া অযোগ্য ঠিকাদাররা অনেক ক্ষেত্রে নির্মাণকাজে রডের বদলে ব্যবহার করছেন বাঁশ। বিশ্বব্যাংকের ফরেনসিক তদন্তেও এমন অনিয়মের ঘটনা বেরিয়ে এসেছে।
সরকারি কেনাকাটার তদারকি সংস্থা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (সিপিটিইউ) গত ছয় বছরে জাল-জালিয়াতি, দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে কালো তালিকাভুক্ত করেছে ৪০০ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে।
জানতে চাইলে কালো তালিকাভুক্ত ডিসেন্ট ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী দিরাজুল ইসলাম দাবি করেন, তার প্রতিষ্ঠানের নামে অন্য কেউ ব্যাংক গ্যারান্টি জালিয়াতি করেছে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের যে প্যাকেজে অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে, তাতে তিনি দরপত্র জমা দেননি। তার প্রতিষ্ঠানকে বিপদে ফেলার জন্য তার সই জাল করে দরপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডকে বিষয়টি জানানো হলেও তা আমলে না নিয়ে তার প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বর্তমানে সরকারি ক্রয়কারী সংস্থা এক হাজার ২৩৩টি। এর মধ্যে কয়েকটি সংস্থার কেনাকাটায় বেশি অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে। সিপিটিইউর হিসাবে সেগুলো হলো- পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), খাদ্য অধিদপ্তর, ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), ভূমি জরিপ অধিদপ্তর, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং গণপূর্ত অধিদপ্তর।
বড় ধরনের জালিয়াতির অভিযোগে সম্প্রতি কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সিকদার কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড বিল্ডার্স। গত ৮ নভেম্বর এই ঠিকাদারকে কালো তালিকাভুক্ত করে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সিল-সই নকল করে জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া কাগজ তৈরি করে কাজ নেওয়ার চেষ্টা করে ওই ঠিকাদার, যা সরকারের একাধিক সংস্থার তদন্তে ধরা পড়েছে।
এ রকম দুর্নীতি ও জাল-জালিয়াতির অভিযোগে সম্প্রতি কালো তালিকাভুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে- আর্জেন্ট মার্কেটিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন, এশিয়ান টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, বেঙ্গল টেকনোলজিক্যাল করপোরেশন, বিল্ডটেক কনসালট্যান্সি অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন, বৃষ্টি ইন্টারন্যাশনাল, কনটেক ডেভিস, সিপিএম সিস্টেম লিমিটেড, ঢাকা স্টেশনারি, দিগন্ত অ্যাডভারটাইজিং, ইঞ্জিনিয়ার্স কনসোর্টিয়াম, ইঞ্জিনিয়ার্স কনস্ট্রাকশন, ইভেন সিটি, জিপি ট্রেডার্স, হায়দার কনস্ট্রাকশন প্রভৃতি।
জানতে চাইলে সিপিটিইউর মহাপরিচালক ফারুক হোসেন বলেন, অনিয়ম, দুর্নীতি, জালিয়াতি, যোগসাজশ এবং টেন্ডারে বাধা দেওয়ার মতো অপরাধের কারণে কালো তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে ঠিকাদারদের। আগের তুলনায় তদারকি বাড়ার কারণে কেনাকাটায় দুর্নীতি, অনিয়ম ও জালিয়াতি বেশি ধরা পড়ছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হাফিজউদ্দিন আহমেদ বলেন, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে অযোগ্য প্রতিষ্ঠান কাজ পাচ্ছে বেশি। ফলে অর্থ ব্যয় হলেও জনগণ এর সুফল পায় না। তিনি বলেন, সরকারের সদিচ্ছার অভাবে এমন ঘটনা বাড়ছে। এ জন্য কালো তালিকাভুক্ত করেই থেমে থাকলে চলবে না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানসহ দুর্র্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সরকারি কেনাকাটায় জালিয়াতি ও অনিয়ম ধরতে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) বর্তমানে বেশ সোচ্চার। এরই মধ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে দুদক। অনিয়মের অভিযোগে পাউবো ও সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদনও দিয়েছে। শিগগিরই এসব কর্মকর্তা এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করবে দুদক।
সিপিটিইউর পরিচালক আবদুল আজিজ বলেন, কালো তালিকাভুক্ত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান দরপত্রে ভুয়া ও জাল কাগজ তৈরি করে কাজ বাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এটা বড় ধরনের অপরাধ। ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির বিশেষ তদন্তে এসব অনিয়ম ধরা পড়ছে। এর পর অপরাধের ধরন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংস্থায় কাজের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে।
ই-টেন্ডারেও জালিয়াতি
সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম, জালিয়াতি ও দুর্নীতি ঠেকাতে ২০১৩ সালের জুনে ই-জিপি বা ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট পদ্ধতি চালু করা হয়। এতে তেমন কোনো কাজ হয়নি। বর্তমানে ৫০ কোটি টাকার নিচের কেনাকাটায় ই-টেন্ডার চালু আছে। নতুন এ পদ্ধতিও জালিয়াতি ও অনিয়ম ঠেকাতে পারেনি। গত দুই বছরে ৯৩টি প্রতিষ্ঠানকে জালিয়াতির দায়ে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
মিউনিসিপ্যাল গভর্ন্যান্স সার্ভিসেস প্রকল্পের সৈয়দপুর পৌরসভার একটি কাজ পেতে রাখা এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে যৌথভাবে ফরিদ উদ্দিন নামের একজন দরপত্র জমা দেন। প্রতিষ্ঠানটি রাজশাহী সিটি করপোরেশনে ১৬ কোটি ২০ লাখ টাকার কাজের একটি সনদও জমা দেয়, যা যাচাই করে দেখা গেছে পুরোপুরি ভুয়া। সান্তাহারে খাদ্যগুদামের কাজ পেতে খুলনার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রাখিন এন্টারপ্রাইজ ভুয়া সনদ দিয়ে কাজ বাগানোর চেষ্টা করলে ধরা পড়ে। এমন ঘটনা প্রায়ই ধরা পড়ছে।
আরো কয়েকটি জালিয়াতির ঘটনা
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, খাদ্য অধিদপ্তরের বস্তা সরবরাহে একাধিক জালিয়াতির ঘটনায় কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। বস্তা সরবরাহের আগেই ভুয়া অগ্রিম প্রত্যয়নপত্র নিয়ে প্রতারণা করে অর্থ তুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি এক তদন্তে দেখা গেছে, খাদ্য অধিদপ্তরের ১৩ কেন্দ্রে বস্তা সরবরাহের কাজ পায় ওহি জুট ফাইবার্স। কিন্তু বস্তা সরবরাহের আগেই তারা ভুয়া প্রত্যয়নপত্র তৈরি করে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
গত জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অডিও ভিজ্যুয়াল কার্যক্রম পরিচালনা এবং মেলা মাঠে লাইটবক্স স্থাপন ও পরিচালনায় দরপত্র আহ্বান করে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। দরপত্রের সঙ্গে ব্যাংকের ভুয়া ডিপোজিট স্লিপ দেয় মেসার্স মিডিয়া ওয়ান অ্যাডভারটাইজিং অ্যান্ড প্রিন্টিং। এ ধরনের প্রতারণার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় ওই প্রতিষ্ঠানকে অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশের (ইজিসিবি) একটি কেনাকাটায় ভুয়া সনদ দিয়ে কাজ নেয় তামাম করপোরেশন। সিঙ্গাপুরের টিওএ ইলেকট্রনিকস পিটিই লিমিটেডের নামে ভুয়া উৎপাদন সনদ জমা দেয়।
কাজ নেওয়া থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ঠিকাদাররা সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে দুর্নীতি ও অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন। চট্টগ্রামে পুলিশ বিভাগের একটি প্রকল্পের কাজে অনিয়ম হওয়ায় একটি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের দামপাড়া, সিএমপি বন্দর থানা, পাহাড়তলী থানা ও আগ্রাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে ভবন মেরামতকাজে অনিয়ম পাওয়া গেছে। ত্রুটিপূর্ণ ও নিম্নমানের মেরামত সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে এসব ভবন মেরামত করা হলেও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ অনিয়মের কারণে তিন বছরের জন্য পুলিশের সব কাজে এমডি এন্টারপ্রাইজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
সিপিটিইউর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সুরমা এন্টারপ্রাইজ এলজিইডির ২০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের কাজ পেতে তদবির করে। কাজ দিলে এক কোটি টাকা ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব দেয় ওই প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে পাঁচ লাখ টাকা নগদ দেবে বলে এলজিইডির কয়েক কর্মকর্তাকে প্রস্তাব দেওয়া হয়, যা ক্রয় আইন, ২০০৬-এর ৬৪ ধারা অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ। এ জন্য হাজি ওসমান গনি রোডের এ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে স্থায়ীভাবে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। একই কারণে রানা বিল্ডার্স প্রাইভেট লিমিটেডকেও কালো তালিকাভুক্ত হয়েছে।
জানতে চাইলে রানা বিল্ডার্স প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলম রানা বলেন, খুলনায় একটি সেতু নির্মাণে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হন তারা। কিন্তু তৃতীয় সর্বোচ্চ দরদাতাকে বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে কাজ দেওয়া হয়েছে। সিপিটিইউ তদন্ত করে দেখে, রানা প্রাইভেট লিমিটেডই যোগ্য ছিল। এরপর এলজিইডির কর্মকর্তারা নিজেদের বাঁচাতে তাদের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ তুলে কালো তালিকাভুক্ত করেছে বলে দাবি করে রানা বিল্ডার্স।’ সিপিটিইউর নথিতে দেখা গেছে, রানা বিল্ডার্স এক কোটি টাকা ঘুষ দিতে চেয়েছিল।
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক ১৩টি প্রকল্পে যোগসাজশের মাধ্যমে কাজ দেওয়ার অভিযোগে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ফেরত চেয়েছে। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে শুধু পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে মাত্র তিন কর্মকর্তাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত বাকি প্রকল্পের কর্মকর্তাদের শাস্তি হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 55 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ