সামাজিক মাধ্যমে রোহিঙ্গা নির্যাতনের ভুয়া ছবি ছড়ানো হচ্ছে

Print

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে মৌলবাদীরা, অনেকে না জেনেই ছড়াচ্ছেন ভুয়া ছবি; উদ্বেগে সংখ্যালঘুরা

rohingya_fake_image_6

জামফেল ইয়েশির কথা মনে পড়ে? চীনা প্রেসিডেন্টের ভারত সফরের প্রতিবাদে ২০১২ সালের ২৬ মার্চ নয়া দিল্লিতে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ২৭ বছর বয়সী এই তিব্বতীয় নাগরিকের জ্বলন্ত ছবি বিশ্ব গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল তখন।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ছবিটিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের ছবি বলে প্রচার করা হয়েছে। এমনকি একটি জাতীয় বাংলা দৈনিক “নির্বিচারে ধর্ষণ, হত্যা” শিরোনাম দিয়ে এই ছবিসহ বেশ কিছু ছবি ছেপেছে।মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা চালাচ্ছে রোহিঙ্গারা যা ঢাকার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ৯ অক্টোবর তিনটি সীমান্ত পোস্টে হামলায় ৯ জন পুলিশ নিহত হওয়ার পর “সন্ত্রাস দমন অভিযান” শুরু করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী।মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, সন্ত্রাস দমনের নামে রোহিঙ্গাদের হত্যা, ধর্ষণ ও ঘরবাড়িতে আগুন দেয়া হচ্ছে। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করছে দেশটির সরকার ও সেনাবাহিনী।জাতিসংঘ জানিয়েছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়টির প্রায় ৩০ হাজার মানুষ নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছেন। ২০১২ সালে সাম্প্রদায়িক সংঘাতে কয়েকশ রোহিঙ্গা নিহত হওয়ার পর এটাই সবচেয়ে গুরুতর নির্যাতনের ঘটনা।রোহিঙ্গাদের নিয়ে মিয়ানমারের অবস্থান নিয়ে যখন বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় উঠেছে ঠিক তখনই এক দল মানুষ ফেসবুক ও টুইটারে ভুয়া ছবি ও ক্যাপশন দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এমনকি বাংলাদেশের কিছু সংবাদপত্র এসব ভুয়া ও অসমর্থিত ছবি ছেপেছে।আবার রোহিঙ্গা নির্যাতনের এসব ছবি আসল নয় এটা না জেনেই কিছু মানুষ এসব ছবি শেয়ার করছেন।সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতারা বলছেন, এসব মিথ্যা তথ্য ছড়ানো একটা উদ্দেশ্য হতে পারে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি করা। বাংলাদেশ বুদ্ধিস্ট ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট প্রফেসর অসীম রঞ্জন বড়ুয়া বলেন, “রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে, সামাজিক মাধ্যমে এমন কিছু ছবি ও পোস্ট দেয়া হয়েছে যা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি করার জন্য করা হয়েছে বলে মনে হয়। রামুর ঘটনার অনুরূপ যে কোন ধরনের ঘটনা নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।”তিনি জানান, মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী রামু ও উখিয়ায় বসবাসকারী বৌদ্ধরা রাখাইন রাজ্যের ঘটনার প্রতিক্রিয়া নিয়ে শঙ্কার মধ্যে রয়েছেন। রামুতে ২০১২ সালে এক বৌদ্ধ যুবকের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের ফটোশপ করা ‘ইসলামবিরোধী’ ছবি ব্যবহার করে একদল ধর্মান্ধ লোক সাম্প্রদায়িক প্রচারণা চালিয়ে এক ডজনেরও বেশি বৌদ্ধ মন্দির ধ্বংস করে।এই প্রতিবেদকের সাথে কথা বলার সময় কিছু সাংবাদিক জানান, এ ধরনের মিথ্যা প্রচারণা মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের দুর্দশাকেই আড়াল করে ফেলে। তাঁরা মনে করেন, ভুয়া ছবি না ছড়িয়ে সবার উচিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাধ্যমে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করা।

rohingya_fake_image_7

সত্য নাকি মিথ্যা

মিয়ানমারে মুসলমানদের হত্যা বন্ধ করার দাবি জানিয়ে বেশ কিছু ফেসবুক পেইজ চালু করা হয়েছে। এরকম একটি পেইজে গত ২০ নভেম্বর পোস্ট করা একটি ছবিতে লাশের স্তূপের পাশে কিছু বৌদ্ধ ভিক্ষুকে দেখা যাচ্ছে। অন্য অনেকগুলো পেইজেও ছবিটি আপলোড করে একে রোহিঙ্গাদের ওপর বৌদ্ধদের নির্যাতন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

তবে বাস্তবতা হলো এই ছবিটি মিয়ানমারেই তোলা হয়নি। এপ্রিল ২০১০ চীনে ভূমিকম্পের পর এই ছবিটি তোলা হয়। সেখানে কুইংহাই প্রদেশের ইউশু কাউন্টিতে একটি পাহাড়ের ওপর ভূমিকম্পে নিহতদের শেষকৃত্যের প্রস্তুতি নিতে দেখা যাচ্ছে তিব্বতীয় ভিক্ষুদের।২০১১ সালে ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো কনটেস্টে দ্বিতীয় পুরস্কার পায় এই ছবি।

rohingya_fake_image_5

তবে এর চেয়েও মজার ব্যাপার হলো হলিউড সিনেমা র্যা ম্বোর পঞ্চম পার্ট ‘লাস্ট ব্লাড’ এর একটি ভিডিও ক্লিপ ফেসবুকে ছড়ানো হয়েছে। ক্যাপশনে লেখা হয়েছে রোহিঙ্গা নির্যাতনের ভিডিও এটি। হেফাজতে ইসলামের সবাইকে ভিডিওটি শেয়ার করার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম এই ভিডিও ছড়ানোর সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার কথা অস্বীকার করেছে।

গত ২০ তারিখ একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী বীভৎস একটি ভিডিও শেয়ার করেন। একটি মেয়েকে আগুনে পুড়তে দেখা যাওয়া ভিডিওটির ক্যাপশন ছিল, ‘বার্মার মুসলমানদের হত্যা বন্ধ কর’। ভিডিওটি সবাইকে শেয়ার করারও আহ্বান জানান তিনি।

rohingya_fake_image_4

এটি আসলে গুয়েতেমালার একটি ঘটনার ভিডিও। ২০১৫ সালের মে মাসে ১৬ বছর বয়সী ওই মেয়েকে পেটানোর পর পুড়িয়ে হত্যা করে একদল লোক। সিএনএন, দ্য ইনডিপেন্ডেন্ট, ডেইলি মেইলসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ছবি ও ভিডিওসহ এই খবরটি প্রকাশ করেছিল।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে আরেকটি ফেসবুক পেইজে বেশ কিছু ছবি পোস্ট করা হয়েছে। পোস্ট করা ছবিগুলোর একটিতে একজন নারীকে দড়ি দিয়ে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। গত ৩০ আগস্ট নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউন ‘শ্বশুরবাড়ির নির্যাতনে মুমূর্ষু অ্যানি এখন হাসপাতালে’ শিরোনামে খবরসহ ছবিটি প্রকাশ করে। গাজীপুর প্রতিনিধিকে উদ্ধৃত করে এই খবর প্রকাশ করে পোর্টালটি।

কারা করছে এই কাজ?

রোহিঙ্গা সংকট, জঙ্গিবাদ ও যুদ্ধাপরাধ নিয়ে দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলফিকার আলি মানিকের। তিনি জানান, রোহিঙ্গাদের সংগঠিত একটি গ্রুপ ভুয়া ছবি ব্যবহার করে পরিকল্পিত ও ব্যাপকভাবে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে।

তিনি জানান, রাখাইন রাজ্যের মংডুর বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশি মোবাইল অপারেটরগুলোর নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। মিয়ানমারে থাকা রোহিঙ্গারা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বাংলাদেশে অবস্থান করা রোহিঙ্গা ও পরিচিত লোকদের এসব ভুয়া ছবি পাঠায়।

মানিক বলেন, “মিয়ানমার থেকে যখন কেউ এ ধরনের ছবি [ভুয়া] পাঠিয়ে বলে যে সেখানে এমন ঘটনা ঘটেছে তখন মানুষ সেটা বিশ্বাস করতে শুরু করে। সরল বিশ্বাস থেকে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ও স্থানীয়রা ছবিগুলো শেয়ার করেন।” এই রোহিঙ্গারা প্রোপাগান্ডা চালিয়ে বিশ্ববাসী ও বাংলাদেশিদের সমবেদনা আদায়ের চেষ্টা করে। মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশে থাকা রোহিঙ্গা সমর্থকরা তাঁদের অনলাইন প্রচারণায় সহায়তা করছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের কনট্রিবিউটর এই সাংবাদিক আরও বলেন, প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে তারা প্রায়ই ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করে। মিয়ানমারের ভেতরে সক্রিয় অনেকগুলো রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গ্রুপ বাংলাদেশে জেএমবি ও হুজি’র মতো জঙ্গি সংগঠনগুলোর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে। স্থানীয় জঙ্গি সংগঠনগুলো এই প্রোপাগান্ডায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

মূলধারার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন কনটেন্টের ওপর নজর রাখেন সাংবাদিক পলাশ দত্ত। তিনি জানান, প্রতিবার মুসলিমদের উপরে সাম্প্রদায়িক হামলার পরে, বার বার একই ছবি প্রকাশ করা হয়েছে | । ডেটা জার্নালিজম নিয়ে কাজ করা এই সাংবাদিক আরও জানান, রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে ভুয়া ছবির প্রচার অন্যান্য যে কোনও বারের তুলনায় এবার মাত্রা ছাড়িয়েছে।

এবারই নতুন নয়

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ছড়ানোর ঘটনা বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। উদাহরণ হিসেবে রামুর ঘটনার কথা বলা যায়। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা পরিকল্পিতভাবে ফটোশপ করা ছবি ব্লুটুথ ও ম্যাসেজের মাধ্যমে মানুষের মোবাইল ফোনে ছড়িয়ে দেয়।

ওই হামলার কয়েক মাস আগেই বিভ্রান্তিকর ক্যাপশনসহ রোহিঙ্গা নির্যাতনের ভুয়া ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। ওই বছর জুন মাসে বহু রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করে। এই রোহিঙ্গারা রামু হামলায় জড়িত ছিল ।

২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে বৌদ্ধদের মন্দির ও বাড়িঘরে হামলায় রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) যুক্ত ছিল। সংগঠনটির নেতা-কর্মীদের সাথে সখ্যতা রয়েছে এমন একজন এই তথ্য জানান।

২০১২ ও ২০১৩ সালেও জামায়াতে ইসলামীর যুদ্ধাপরাধী নেতাদের বহু প্রতীক্ষিত বিচারের বিরুদ্ধেও অনলাইনে ব্যাপকভাবে ভুয়া ছবি ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হয়।

জামায়াতপন্থি ফেসবুক পেইজ বাঁশের কেল্লা ও দক্ষিণপন্থি কিছু সংবাদপত্র এই প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কয়েকটি সংবাদপত্র পবিত্র কাবা শরিফের গিলাফ পরিবর্তন করার ছবি ছাপিয়ে বলে, বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিবাদে পবিত্র কাবা শরিফের খতিব মানববন্ধন করেছেন।

উদ্বেগ

বাংলাদেশ বুদ্ধিস্ট ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট প্রফেসর অসীম রঞ্জন বড়ুয়া জানান, চলমান পরিস্থিতি নিয়ে তাঁরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া ছবি ছড়ানো নিয়ে মঙ্গলবার বৈঠক করেছে ফেডারেশন। উদ্বেগজনক বিষয়গুলো ইতিমধ্যে তাঁরা পুলিশ সদর দপ্তরকে জানিয়েছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী আশ্বাস দিয়ে বলেছে, বিষয়টি নিয়ে সজাগ রয়েছে তারা।

ইতিহাস বিষয়ক বিশিষ্ট অধ্যাপক মুনতাসির মামুন বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে কিছু ভুয়া ছবি ছড়ানো হলেও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিষয়টি অস্বীকার করা যায় না। তিনি বলেন, “এটা সত্য যে, রোহিঙ্গাদের গ্রামে হামলা চালানো হচ্ছে।”

যোগাযোগ করা হলে পুলিশের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (মিডিয়া অ্যান্ড প্ল্যানিং) একেএম শহিদুর রহমান জানান, অনলাইন প্রোপাগান্ডার ওপর নজর রাখছেন তাঁরা। তিন বলেন, “সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা সাধারণত ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।”

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 234 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
error: