হেপাটাইটিস বি রোগের কারণ ও লক্ষণসমূহ এবং চিকিৎসা

Print
হেপাটাইটিস বি রোগের কারণ ও লক্ষণ সমূহ

হেপাটাইটিস বি প্রাণঘাতী মারাত্মক রোগ। এই রোগের চিকিৎসা এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয় নি। সে কারণে এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য কোনো চিকিৎসা নেই। পৃথিবীর প্রায় ২৪০-৩৮০ মিলিয়ন নারী-পুরুষ দীর্ঘ মেয়াদের জন্য তাদের দেহে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের জীবাণু বহন করে চলছে।

প্রতি বছর ১০-৩০ মিলিয়ন মানুষ নতুন করে হেপাটাইটিস বিতে আক্রান্ত হচ্ছে। তবে এই রোগটি নির্মূলের উপায় না থাকলেও রয়েছে প্রতিষেধক টিকা।

সকলের হেপাটাইটিস বি রোগ সম্পর্কে সতর্ক থাকা উচিত এবং সময় থাকতেই প্রতিষেধক টিকা নিয়ে রাখা উচিত।
নীরব ঘাতক হেপাটাইটিস বি রোগে আক্রান্তের কারণ ও লক্ষণ।

হেপাটাইটিস বি রোগে আক্রান্তের কারণ:

# রক্তক্ষরণ ও অন্যান্য কারণে সৃষ্ট রক্তশূন্যতার চিকিৎসায় বারবার ব্লাড ট্রান্সফিউশন গ্রহণ করা হলে।
# কিডনি ফেইল হওয়ার কারণে ডিমো-ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে।
# হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে সংক্রমিত নারী-পুরুষের মধ্যে এবং একাধিক নারী-পুরুষের সঙ্গে যৌন মিলন হলে।
# ইনজেকশনের মাধ্যমে ড্রাগ বা মাদকদ্রব্য সরাসরি রক্তনালীতে প্রবেশ করালে।
# একই সুঁই ও সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করলে।

# রোগীর দেহ থেকে রক্ত নেয়া, স্যালাইন বা ইনজেকশনের মাধ্যমে ওষুধ দেয়ার সময় কিংবা ল্যাবরেটরিতে রক্ত ও রোগীর দেহ থেকে নেয়া তরল পদার্থ নিয়ে পরীক্ষা করার সময় অসাবধানতাবশত হেপাটাইটিস বি সংক্রমিত রক্ত কিংবা অন্য তরল জাতীয় পদার্থ স্বাস্থ্য কর্মীদের রক্তের সংস্পর্শে চলে এলে তারাও এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।

# হেপাটাইটিস বি রোগে আক্রান্ত মায়ের গর্ভজাত সন্তানদের এই রোগটিতে আক্রান্ত হওয়া সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।

হেপাটাইটিস বি রোগের লক্ষণ:

# সব সময় গা ম্যাজ ম্যাজ করতে থাকা,
# অবসাদ বোধ করা,
# বেশীরভাগ সময়েই মাথা ব্যথা থাকা,
# গা চুলকানো,
# হাড়ের জয়েন্টে ব্যথা থাকা, বিশেষ করে ডান দিকের উপরিভাগের জয়েন্টে,
# ক্ষুধামন্দা ভাব থাকা,
# বমি বমি ভাব থাকা এবং কারণ ছাড়াই বমি হওয়া,
# জ্বর জ্বর অনুভূত হওয়া,
# চোখ ও প্রস্রাবের রঙ হলুদ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।

হেপাটাইটিস বি নিরূপণের উপায়:

রোগের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের অস্তিত্ব শনাক্ত করতে হবে। সাধারণত রক্তে হেপাটাইটিস বি সারফেস অ্যান্টিজেন, হেপাটাইটিস বি আইজিএম কোর অ্যান্টিজেন, হেপাটাইটিস বি ই এন্টিজেন ও সেই সঙ্গে লিভার এনজাইমের অধিক মাত্রা নিশ্চিতভাবে হেপাটাইটিস বি-এর একিউট সংক্রমণের কথা বলে দেয়।

ক্রনিক বা দীর্ঘ মেয়াদি হেপাটাইটিস বি নিশ্চিত হওয়ার জন্য রক্তে হেপাটাইটিস বি সারফেস অ্যান্টিজেনের দীর্ঘ মেয়াদি উপস্থিতি, হেপাটাইটিস বি কোর আইজিজি (ওমএ) অ্যান্টিজেন, হেপাটাইটিস ই এন্টিজেন ও লিভার এনজাইম পরীক্ষা অত্যন- জরুরি। আর সময়ের ব্যবধানে বি ভাইরাস দেহ থেকে নিঃসৃত হয়ে গেলে রক্তে হেপাটাইটিস বি সারফেস অ্যান্টিজেনের মাত্রা হ্রাস পেয়ে এক সময় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে এবং ভবিষ্যতের জন্য হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধক হেপাটাইটিস বি কোর এন্টিবডি ও বি সারফেস অ্যান্টিবডি তৈরি করে।

কতগুলো বিষয়ে সতর্ক থাকলে এ রোগ থেকে দুরে থাকা সম্ভব ।

# ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা।
# ইনজেকশন ব্যবহারের সময় ডিসপোসিবল সিরিজ ব্যবহার করা।
# দাঁতের চিকিৎসার সময় জীবাণুমুক্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া।
# রোগের বিরুদ্ধে নিজের শরীরে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা । হেপাটাইটিস বি-র টিকা ৪টি ডোজ নেওয়া। প্রথতিনটি
১ মাস পর পর এবং চতুর্থ ডোজটি প্রথম ডোজের ১ বছর পর নিতে হয়।

চিকিৎসা:
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সব নবজাতককে হেপাটাইটিস বি’র টিকা নেয়া অত্যন্ত জরুরি বলে ঘোষণা করেছে এবং ইতোমধ্যে ৮০টির বেশি দেশ এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে টিকা দেয়ার সম্প্রসারিত কর্মসুচি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ সরকার সকল শিশুকে হেপাটাইটিস বি ভ্যাক্সিন দেয়ার জন্য একে ইপিআই ভ্যাক্সিন কার্যক্রমের অর্ন্তভুক্ত করেছে। এ টিকা যে কোনো বয়সে যে কোনো দিন নেয়া যায়। শতকরা নব্বই ভাগ মানুষের শরীরে এই ভ্যাক্সিন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলে ।

নীরব ঘাতক এ সংক্রামক ব্যাধিটি প্রতি মিনিটে কেড়ে নেয় দুজন নারী-পুরুষের প্রাণ। এ রোগ থেকে মুক্ত থাকতে সবার প্রতিষেধকমুলক ব্যবস্থা নেয়া উচিত। সর্বোপরি এ মহামারী থেকে বাচাঁর জন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে।

নিরাময় বা চিকিৎসা:
হেপাটাইটিস ‘বি’ এর শতভাগ সফল চিকিৎসা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি, অনেক ক্ষেত্রে নতুন উদ্ভাবিত ঔষধ গুলো ভাল ফল দিছে বলে গবেষকরা দাবি করলেও আপাত কোনও বিশ্বস্ত ঔষধ বাজারে আসেনি। হেপাটাইটিস ‘বি’ আক্রান্তের চিকিৎসা শুরু করবার আগে যেটা নিশ্চিত হতে হয় তা হল ভাইরাসের DNA (পরিমাণ ও ধরন) পরীক্ষা। DNA পরীক্ষা যদি পজিটিভ হয় তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিশ্চিত হয়ে নেন আক্রান্ত রোগীর Portal Hypertension অথবা অন্য কোন জটিলতা আছে কিনা। তার ফাইব্রোসিস পরিবর্তন বা সিরোসিস হয়েছে কিনা, এসোফেগাল ভ্যারিক্স (গলবিলের নিচের অংশে এক ধরনের রক্ত-বাহিত শিরা)এ কোনো পরিবর্তন এসেছে কিনা। সাধারণত লিভার এর পরিবর্তনের(সিরোসিস) সাথে সাথে এসোফেগাল ভেরিক্স গুলো বদলে যায়। রক্তের ক্রমাগত চাপে এই ভ্যারিক্স গুলো ছিঁড়ে গিয়ে রোগীর নাক-মুখ দিয়ে রক্তপাত ঘটতে পারে, এবং রোগীর মৃত্যু হতে পারে। উন্নত বিশ্বে ভ্যারিক্স চিকিৎসায় এক ধরনের কৃত্রিম রক্তনালী (Steosis) তৈরি করে লিভারের অকার্যকর অংশ থেকে রক্তনালী সরাসরি ভ্যারিক্স এ প্রবাহিত করা হয়। বিকল্প হিসেবে আমাদের দেশে EVL বা এসোফেগাল ভ্যারিক্স লাইগেশন পদ্ধতি চালু আছে। তুলনামূলক ভাবে যার খরচ অত্যন্ত কম। মাত্র ১০/১২ হাজার টাকায় ৩/৪ টি ভ্যারিক্স লাইগেশন করা সম্ভব। এরপর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোগীর ডায়াবেটিক বা অন্য কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা জেনে নিয়ে রোগীর জন্য থেরাপি নির্ধারণ করবেন। হেপাটাইটিস ‘বি’ এর চিকিৎসায় এখন খাবার ট্যাবলেট বেরিয়েছে যা খুব বেশি ব্যয় বহুল নয়। কার্যকর চিকিৎসা হলো ইন্টারফেরন, পেগালিটেড ইন্টারফেরন আলফা ২-বি বা পেগাসিস। সাথে মুখে খাবার ঔষধ ল্যামিভুডিন, এডিফোভির আর সর্বশেষ সংযোজন টেলবিভুডিন ইত্যাদি। উন্নত চিকিৎসার আশায় আজকাল অনেকেই বাংলাদেশ ছেড়ে ব্যাংকক,ভারত কিম্বা থাইল্যান্ডে যান। আসলে আমাদের দেশে অণুজীব বিজ্ঞান গবেষণা এবং এ ধরনের রোগ নির্ণয়ের যে সমস্ত ল্যাবরেটরি আছে তা মান সম্মত নয় বিধায় অনেক রোগীকে তার PCR পরীক্ষার জন্য রক্ত ভারত-সিঙ্গাপুর প্রেরণ করতে হয়। বাংলাদেশে বিভিন্ন ল্যাব এই টেস্টগুলো করছে তবে মোটেও নির্ভুল পরীক্ষা করতে পারছেনা। আমাদের দেশের আলট্রা-সাউন্ড মেশিনগুলোর মান কিম্বা সনো-লজিস্টদের দক্ষতা এতই কম যে তারা সঠিক ভাবে রোগ নিরূপণ করতে পারেনা। তারপরেও বর্তমানে বাংলাদেশে হেপাটাইটিস ‘বি’ এর চিকিৎসায় ডাক্তারগণ পাশ্চাত্যের তুলনায় ভালো ফল পাচ্ছেন। হেপাটাইটিস ‘বি’ আক্রান্ত রোগীর জন্য কতিপয় টিপস: যৌন সম্ভোগের সময় কনডম ব্যবহার করুন। কাঁচা সালাদ, ফল-মূল বেশি খাবেন। তেল-চর্বি যুক্ত খাবার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। গরু বা খাসির মাংস যেগুলো লাল মাংস হিসেবে পরিচিত এগুলো খাবেন না। লবণ বা সোডিয়াম সল্ট একেবারেই খাবেন না। ভিটামিন বি, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যথা বিটা ক্যারোটিন, ভিটামিন-সি, ভিটামিন-ই যুক্ত খাবার বেশি খাবেন। প্রতিদিন অন্তত ৪০ মিনিট হাঁটবেন। ব্যায়ামের অভ্যাস করবেন। দিনে একবেলার বেশি ভাত খাবেন না, দুই বেলা রুটি খাবেন। ধূমপান, মদ্যপান নিষিদ্ধ। অযথা কোন মাল্টিভিটামিন খাবেন না। প্রচুর বিশ্রাম নিন। শৃঙ্খলিত জীবন যাপন করুন। পাঠকের উদ্দেশ্যে বলি, আপনি আজ-ই HBsAG পরীক্ষা করে নিন। নিজের এবং পরিবারের সবার। যদি এখনও সংক্রমিত না হয়ে থাকেন তবে অতি দ্রুত হেপাটাইটিস-বি এর প্রতিষেধক টীকা নিন। হেপাটাইটিস ‘বি’ সংক্রমণ থেকে রেহাই পেতে প্রতিরোধ-ই একমাত্র উপায়।

 

এইডস থেকেও ভয়ঙ্করঃ হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস লিভার সিরোসিস এবং লিভার ক্যান্সারের কারণ

বিশ্বে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকারক ভাইরাস হেপাটাইটিস-বি, যার সংক্রমণ ঘটছে খুব দ্রুত। এর ভয়াবহতা এইডসের চেয়েও ভয়ঙ্কর, যা সমগ্র মানবজাতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস অ্যাকিউট হেপাটাইটিস বা জন্ডিসের উল্লেখযোগ্য কারণ এবং ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী লিভার ডিজিজের প্রধান কারণ। মানবদেহের লিভার বা যকৃৎ কোনো কারণবশত এ ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হলে তাকে ভাইরাল হেপাটাইটিস বলা হয়। অনেকে যাকে জন্ডিস বা আঞ্চলিক ভিত্তিতে ‘কামেলা’ রোগ বলে থাকেন। লিভারের একিউট এবং ক্রনিক সংক্রমণের জন্য দায়ী মোট ৫ ধরনের লিভার ভাইরাস হচ্ছে – হেপাটাইটিস-এ, হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, হেপাটাইটিস-ডি এবং হেপাটাইটিস-ই।


বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিবছর সারাবিশ্বে শুধু হেপাটাইটিস বি ও সি’র সংক্রমণে মারা যাচ্ছে প্রায় ১১ লাখ মানুষ। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশ হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের দীর্ঘমেয়াদি বাহক এবং এদের ২০ শতাংশ লিভার ক্যান্সার ও সিরোসিসে মারা যেতে পারে।


পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পৃথিবীতে প্রতিবছর ২ থেকে ৫ লাখ নবজাতক হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে জন্মগ্রহণ করে যারা ভবিষ্যতে এই রোগের বাহক হয়। বলা হয়, বাস্তবে হেপাটাইটিস-বি এইডসের চেয়ে ১০০ গুণ বেশি সংক্রামক এবং প্রতিবছর এইডসের কারণে পৃথিবীতে যত লোক মৃত্যুবরণ করে তার চেয়ে বেশি মৃত্যুবরণ করে হেপাটাইটিস-বি’র কারণে।


বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে প্রবেশের পূর্বশর্তই হলো হেপাটাইটিস-বি’র পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া যে, সংশ্লিষ্টের শরীরে হেপাটাইটিস-বি’র জীবাণুর সংক্রমণ আছে কিনা। যদি শরীরে হেপাটাইটিস-বি’র জীবাণু পাওয়া যায় তবে বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও চাকরি বা কাজ করতে যাওয়া বাধাগস্ত হয়।

হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস সংক্রমণে সংঘটিত হতে পারে পৃথিবীর অন্যতম প্রাণঘাতি রোগ লিভার সিরোসিস এবং লিভার ক্যান্সার। হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস মূলতঃ লিভারকে আক্রমণ করে এর কোষগুলোকে ধ্বংসের মাধ্যমে লিভার অকেজো করে দেয়। লিভারে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহকে ক্রনিক হেপাটাইটিস বলে। ক্রনিক হেপাটাইটিস দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে একসময় লিভার সিরোসিসের উৎপত্তি হয়।


লিভার সিরোসিস লিভারের মারাত্মক রোগ। এ রোগে লিভারের স্বাভাবিক কোষগুলো নষ্ট হয়ে যায় এবং লিভারের ভেতর ফাইব্রাশ টিস্যুঘেরা নডিউল সৃষ্টি হয়। ফলে লিভারের কর্মক্ষমতা কমে যায় বা বিনষ্ট হয় এবং লিভারের ভেতর দিয়ে রক্ত চলাচল বিঘ্নিত হয়। একপর্যায়ে জন্ডিসে আক্রান্ত লিভারটি বিকৃতভাবে গলে-পচে গিয়ে মানুষের প্রাণশক্তি কেড়ে নেয়।


হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় একলাখ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। বর্তমানে এদেশে ১২ শতাংশ লোক এ রোগে আক্রান্ত, যারা আমাদের অসাবধানতা এবং অসচেতনতার কারণে প্রতিদিন আরো হাজার হাজার লোককে আক্রান্ত করছে। সারাবিশ্বে ৩০ থেকে ৪০ কোটি মানুষ এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে। এদের মধ্যে ৫০০ মিলিয়ন লোক ক্রনিক আকারে সংক্রমিত। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫ ভাগ হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদি বাহক।


এটি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। কিন্তু যেভাবে এইডস্ ছড়ায়, প্রায় একই পন্থায় এ রোগেও মানুষ নিজের অজান্তেই আক্রান্ত হয়। সংক্রমিত সুচেঁর মাধ্যমে রক্তদান, রক্তগ্রহণ বা সংক্রমিত রক্তগ্রহণ, সংক্রমিত লোক বা বাহক থেকে অন্যের মধ্যে সংক্রমণ (টুথব্রাশ, ইঞ্জেকশনের সুঁচ, রেজার, চায়ের কাপ, পানির গ্লাস, মুখের লালা ইত্যাদির মাধ্যমে), জন্মের সময় বাহক মাতা থেকে নবজাতকে সংক্রমণ এবং সংক্রমিত পুরুষ থেকে নারী বা নারী থেকে পুরুষে যৌনমিলনের মাধ্যমে সংক্রমণ এ রোগের জন্য দায়ী। হেপাটাইটিস-বি এমন একটি রোগ যা তেমন কোনো লক্ষণ প্রকাশ না করে শরীরে ঘাপটি মেরে থাকতে পারে কিন্তু ততদিনে রোগীর লিভার বা যকৃৎ অনেকটাই ধ্বংস হয়ে যায়।


রক্তপরীক্ষা করলে বোঝা যায় শিরায় বিলিরুবিনের মাত্রা অর্থাৎ জন্ডিস কতটা ও হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস আছে কিনা, অর্থাৎ এইচবিএসএজি পজিটিভ কিনা। এর আগে বুকের ডানপাশে হালকা ব্যথা হতে পারে। অজীর্ণ বা বদহজমের ভাব এমনকি আলসারের মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে। সুতরাং একমাত্র রক্তপরীক্ষার মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া যায় যে, কারো শরীরে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস আছে কিনা। রক্তপরীক্ষায় ভাইরাস না থাকলে যে কেউ আত্মরক্ষার্থে আগাম টিকা নিয়ে এ রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধশক্তি গড়ে তুলতে পারে। আর দুর্ভাগ্যক্রমে রক্তপরীক্ষার ফলাফল পজিটিভ হলে অর্থাৎ এই হেপাটাইটিস বি’র উপস্থিতি প্রমাণিত হলে অবশ্যই তাকে দ্রুত এবং যথাযথভাবে চিকিৎসা করাতে হবে।


এ রোগের চিকিৎসার চেয়ে রোগপ্রতিরোধই উত্তম। সুতরাং এই সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার একমাত্র উপায় হলো, এ রোগের বিরুদ্ধে নিজের শরীরে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা অর্থাৎ আগাম টিকা নেওয়া। হেপাটাইটিস-বি এর টিকা ৪টি ডোজ নিতে হয়। প্রথম ৩টি ডোজ ১ মাস পরপর এবং ৪র্থ ডোজটি প্রথম ডোজের ১২ মাস বা ১ বছর পর নিতে হয়। অর্থাৎ ০, ১, ২ ও ১২ মাস। এছাড়া আরেক ভাবেও এ টিকা দেওয়া যেতে পারে। ০, ১ ও ৬ মাস অর্থাৎ ১ম ডোজের ১ মাস পর ২য় ডোজ এবং ৬ মাস পর ৩য় ডোজ দিতে হবে। শিশুর জন্য এ টিকা খুবই জরুরি।


তবে বি-ভাইরাসজনিত ক্রনিক হেপাটাইটিস সময়মতো চিকিৎসা করলে রোগের অগ্রগতি বন্ধ করা সম্ভব এবং লিভার সিরোসিস প্রতিকার করা সম্ভব। হেপাটাইটিস-বি এর চিকিৎসার জন্য যে ওষুধ আবিস্কৃত হয়েছে, তা বেশ কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। একটানা দুই বছরের বেশি সময় ধরে চিকিৎসা করে শতকরা ৫০ জনের ক্ষেত্রে আশানুরূপ ভালো ফল পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে এ ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হচ্ছে।

আরো প্রমাণিত হয়েছে, যতো বেশিদিন চিকিৎসা দেওয়া যায়, রোগীর জন্য তা ততো উপকারী। এমনকি গবেষণায় এও দেখা গেছে, আবিস্কৃত ওষুধ ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করতে না পারলেও লিভারের কর্মক্ষমতায় উন্নতি ঘটায় এবং সিরোসিস হ্রাসেরও কারণ ঘটায়। আশার কথা আমাদের দেশেও এখন এ ওষুধের প্রয়োগ শুরু হয়েছে। একদিন হয়তো লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হবে।(তথ্যসূত্রঃ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, উইকিপিডিয়া এবং ইন্টারনেট)

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 431 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ