২৩ শিক্ষার্থীর ৪ শিক্ষক

Print

%e0%a7%a8%e0%a7%a9-%e0%a6%b6%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a5%e0%a7%80%e0%a6%b0-%e0%a7%aa-%e0%a6%b6%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%95সুন্দর একটি ভবন, বিদ্যালয়ের শিক্ষকও কর্মরত আছেন ৪ জন তবে ছাত্র-ছাত্রী ২৩ জন তাও আবার প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। বিদ্যালয়ে ক্লাসরুমে উপস্থিত থাকে ৫ থেকে ১০ জন শিক্ষার্থী। এটি নড়াইল সদর উপজেলার আগ্রাহাটি গ্রামটি অবস্থিত। বিদ্যালয়টির নাম আগ্রাহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই গ্রামে ১৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আগ্রাহাটি প্রাইমারী স্কুল। গ্রামের এই স্কুল থেকে এ বছর কোন শিক্ষার্থী প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না।
শুধু তাই নয় ২০০৮ সালের পর থেকে এই স্কুলে ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম শ্রেণিতে কোন ছাত্র-ছাত্রী পড়ছে না। সর্বশেষ ২০০৮ সালে ২ জন শিক্ষার্থী ৫ম শ্রেণিতে, ১জন ৪র্থ, ২জন ৩য়, ২জন ২য় এবং ১ম শ্রেণিতে পড়তো ১০ জন। বর্তমানে স্কুলে ৪জন শিক্ষক থাকলে ও শিশু শ্রেণিসহ কাগজে কলমে মোট ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ২৩ জন। একই অবস্থা পার্শ্ববর্তী নন্দকোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েরও।
সরেজমিন দেখা গেছে, ৩জন শিশু শ্রেণির ছাত্র বাড়ির দিকে হাঁটছে। একটি ক্লাসরুমের ভিতর বসে আছে ১ম শ্রেণির ৪ জন, আর ২য় শ্রেণির ২জন শিক্ষার্থী, স্কুলে সব মিলিয়ে উপস্থিত ৯ জন ছাত্র-ছাত্রী। ৪ জন শিক্ষক তার দুইজন উপস্থিত আছে প্রধান শিক্ষক ছুটিতে আর বাকি একজন শিক্ষক নাশকতার মামলার কারণে সাময়ীক বরখাস্ত আছেন প্রায় বছর হল।
স্কুলের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী আদুরী জানায়, আমাদের ক্লাসে কয়জন ছাত্রছাত্রী তা আমি জানি না। আমি সুলতানা, মাজেদা ও মারুফা আমরা এই ৪জন প্রতিদিন স্কুলে আসি।
স্কুলের ২য় শ্রেণির ছাত্রী লামিয়া জানায়, আমাদের শ্রেণিতে মোট ৪জন ছাত্র আছে এর মধ্যে আমি ও তানজিলা প্রতিদিন স্কুলে আসি লিমু ও সাব্বির আসে না।
স্কুলের এমন দূরাবস্থার খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নড়াইল সদরের বাঁশগ্রাম ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী টাবরা, নন্দকোল গ্রামে একসময় প্রায় ৫’শ হিন্দু পরিবার বসবাস করতো। এই গ্রামগুলোর সাথে লাগোয়া লোহাগড়া উপজেলার দাঙ্গাপ্রবন কুমড়ী গ্রাম। কুমড়ী বিলের মধ্যে গ্রামদুটির অবস্থান হওয়ায় এখানকার বসবাসরত নিম্নবর্ণের (জেলে,নমশুদ্র) হিন্দুদের উপর দাঙ্গাবাজ কুমড়ী গ্রামের লোকদের অত্যাচারের ফলে এলাকার হিন্দুরা দেশ ছাড়তে শুরু করে। ৭৫ সালের পর থেকে ১৯৯১ সাল নাগাদ গ্রামগুলোর সব হিন্দুরা এলাকা ছাড়া হবার পরে জনসংখ্যা শূণ্যের কোঠায় নেমে আসে। পরবর্তীতে কুমড়ী থেকে আসা মুসলমানরা বসতি শুরু করলে ও বিল এলাকায় যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী গত ২৬ বছর ধরে কমতে কমতে এখন বেহাল দশা।
আগ্রাহাটি সরকারি প্রাইমারী স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ও শিক্ষার্থীর অভিভাবক মিজানুর রহমান জানান, বর্ষকালে এখানকার রাস্তা ভালো থাকে না তাই ছাত্র পাওয়া যায় না। চানপুরের কিছু অভিভাবকের সাথে আমাদের যোগাযোগ হয়েছে আগামী বছর থেকে ১০ জন ছাত্র পাওয়া যাবে আশা করি।
পাশ্ববর্তী কুমড়ী গ্রামের পশ্চিম পাড়া থেকে ২৬ বছর আগে আগ্রাহাটি গ্রামে আসেন মিন্টু খাঁ তিনি জানান, আমরা যখন এখানে চলে আসি তখন এই গ্রামে প্রায় সাড়ে ৩’শ ঘর নমসুদ্দুর(জেলেসহ নিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক) ছিলো। সে সময়ে এই স্কুলে ২’শ থেকে আড়াইশো ছাত্রছাত্রী ছিলো। কিন্তু আস্তে আস্তে তারা ভারতে চলে যাবার পরে এই গ্রাম একসময় মানুষশূন্য হয়ে পড়ে।
স্কুলের সহকারী শিক্ষক শরীফ মোজাফফর হোসেন জানান, স্কুলের এই অবস্থা চলছে দীর্ঘদিন ধরে। গ্রামের ভোটার সংখ্যা ৫০এর কম আমরা এলাকায় ঘুরে ছাত্রছাত্রী সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এই স্কুলে উপবৃত্তি ও খাবারের ব্যবস্থা করলে ছাত্রছাত্রী বাড়বে। আমি দুই বছর হলো এই অবস্থা দেখছি, তাছাড়া ২০০৯ সাল থেকে এই স্কুলে ৩য় থেকে ৫ম শ্রেণির কোনছাত্র ভর্তি হয়নি।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল বাশার মিনা জানান, আমি ২০১০ সালে এই স্কুলে যোগদান করার সময় ছাত্র ছিলো ১১ জন পরে আরো কয়েকজন ছাত্র ভর্তি হয়। তবে এখানে ভর্তি হবার পরে উপবৃত্তির আশায় ছাত্রছাত্রীরা অন্য স্কুলে চলে যায়। আশাকরি আগামীতে ছাত্রছাত্রী বাড়বে।
জেলা প্রাথমিক অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় জেলায় মোট ৫১৭ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৪ হাজার ৪’শ ২৬ জন এবং এবতেদায়ী মাদরাসা ও কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ১হাজার ৩’শ ১২জন সহ মোট ১৫হাজার ৭’শ ৩৮ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহন করছে। তবে ব্যতিক্রম কেবল নড়াইল সদরের আগ্রাহাটি ও নন্দকোল-সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমাপনী পরীক্ষায় এই দুই স্কুলের কোন ছাত্রছাত্রী অংশ নিচ্ছে না।
নড়াইল সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানান, দীর্ঘ বছর ধরে আগ্রাহাটি এবং নন্দকোল গ্রামের প্রাইমারি স্কুল দুটোর একই অবস্থা চলছে। এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে জনপ্রতিনিধিদর সাথে কথা বলেছি। এলাকার রাস্তা উন্নয়ন এবং শিশুদের টিফিনের ব্যবস্থা হলে এ সংকট আর থাকবে না। আগামী বছরে ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম শ্রেণিতে ছাত্র ভর্তি হলে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করাতে পারবো বলে তিনি আশা করেন।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 53 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ