৩ হাজার কোটি টাকার বোঝা চাপালো সোনালী ব্যাংকের ওপর

Print

%e0%a7%a9-%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%95%e0%a7%8b%e0%a6%9f%e0%a6%bf-%e0%a6%9f%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a7%8b%e0%a6%9d%e0%a6%be-%e0%a6%9a%e0%a6%beরূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও পরিবেশ সমীক্ষা এখনো শেষ হয়নি। কিন্তু তার আগেই ৩ হাজার কোটি টাকার বোঝা চাপল সোনালী ব্যাংকের ওপর। ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদনে বৃহৎ ঋণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এটি। সোনালী ব্যাংকের সর্বশেষ নিরীক্ষিত প্রতিবেদনে বড় ঋণ হিসেবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিপরীতে ৩ হাজার কোটি টাকা দেখানো হয়েছে।
২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে রাশিয়ার অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট। প্রকল্পের শর্ত মোতাবেক কাজ শুরুর আগেই প্রতিষ্ঠানটিকে ১০ কোটি ডলার পরিশোধের কথা। সেজন্যই এ অর্থ নেয়া হয়েছে বলে দাবি প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের। সেই সঙ্গে প্রকল্পের অন্যান্য কর্মসূচি বাবদ ব্যয়নির্বাহের বিষয়টিও রয়েছে।
জানতে চাইলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিচালক ড. শওকত আকবর বণিক বার্তাকে বলেন, বিদেশী কোনো সংস্থা বা দেশের সঙ্গে এ ধরনের ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরের পর আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে লেনদেনের দায়িত্বে থাকে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনক্রমে অন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকও অনেক সময় এ দায়িত্ব পালন করে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি দেখভাল করছে সোনালী ব্যাংক। তাদের মাধ্যমেই প্রকল্পের জন্য অর্থ ছাড় করা হচ্ছে। এটি ঋণের কোনো বিষয় নয়।
রাশিয়ার সহায়তায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি)। প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ব্যয় হবে আরো দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সামগ্রিক ক্যাপিটাল ব্যয় দাঁড়াবে কিলোওয়াটপ্রতি ৫ হাজার ৫০০ ডলার, যা এ অঞ্চলের একই ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। চলতি বছর রাশিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে একটি চুক্তি করেছে ভারত। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপিটাল ব্যয় হবে কিলোওয়াটপ্রতি ২ হাজার ৯৫৫ ডলার।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয়ের ৯০ শতাংশ ঋণ হিসেবে দিচ্ছে রাশিয়া। বাকি অর্থের সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট (কিলোওয়াট ঘণ্টা) বিদ্যুৎ উত্পাদনে ব্যয় ৭ টাকা থেকে ৯ টাকা ৪০ পয়সা। এ কেন্দ্রের পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণে বার্ষিক ব্যয় ৫১ কোটি ৮০ লাখ ডলার। জ্বালানি বাবদ প্রতি বছর ব্যয় হবে ১১ কোটি ২০ লাখ ডলার। আর মেয়াদ শেষে কেন্দ্রটি অপসারণ করতে ব্যয় হবে আড়াই কোটি ডলার।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রকল্প প্রস্তাবনায় নানা অসঙ্গতি রয়েছে বলে মনে করছে পরিকল্পনা কমিশন। এর মধ্যে রয়েছে— জনবলের আধিক্য, গাড়ি, অবকাঠামোগত স্থাপনা, প্রকল্পের মেয়াদসহ আরো বেশকিছু বিষয়। প্রকল্পের মূল ব্যয়েও রয়েছে অসঙ্গতি। মূল ব্যয়ের ক্ষেত্রে ডিপিপির এনেক্সার কোড মানা হয়নি। এছাড়া উচ্চপ্রযুক্তির এ প্রকল্পের ই-বর্জ্য নিঃসরণ নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে। পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির সর্বোচ্চ মাত্রা থাকলেও এখন পর্যন্ত পরিবেশ ছাড়পত্র মেলেনি।
প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ৩৬৯ জনবলের বেতন-ভাতা হিসেবে ৬৯৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এর মধ্যে বেতন ৩৬ শতাংশ ও ভাতা ৬৪ শতাংশ। তবে মোট জনবল ২ হাজার ৫৩৫ জনের মধ্যেও এ ৩৬৯ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেখানেও তাদের বেতন কাঠামোর ভিন্ন একটি তালিকা দেয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবলের ক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই এ তালিকা করা হয়েছে বলে মনে করছে কমিশন।
এছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমিশনিং, স্টার্টআপ এবং পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের এ কর্মকর্তাদের মূল বেতন ধরা হয়েছে মাসিক সর্বোচ্চ ২ লাখ থেকে সর্বনিম্ন ১৬ হাজার টাকা। বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ধরা হয়েছে ৫ শতাংশ হারে। এসব কর্মকর্তার বাড়িভাড়া ভাতা, চিকিত্সা ভাতা, যাতায়াত ভাতা, শিক্ষা ভাতা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও তেজস্ক্রিয় ভাতা, শিফট ভাতা ও বিদ্যুৎ বিল ভাতা যেমন নির্ধারণ করা হয়েছে, তেমনি বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে আরো ৩ হাজার ৯০১ কোটি টাকা দেয়া হচ্ছে, যা সংস্থার নিয়ম-পরিপন্থী বলে মনে করে পরিকল্পনা কমিশন।
জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ড. শওকত আকবর এ প্রসঙ্গে বলেন, সরকারি চাকরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও ইনক্রিমেন্টের ব্যবস্থা থাকে। প্রকল্পে সে সুযোগ না থাকায় ধারণার ভিত্তিতে একটি বেতন-ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যান্য ব্যয়ের ক্ষেত্রেও কিছুটা সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছিল। তবে পরিকল্পনা কমিশন যে নির্দেশনা দেবে, সে অনুযায়ী ডিপিপি ঠিক করা হবে।
প্রকল্পের যানবাহন ক্রয়ের ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের জারিকৃত পরিপত্র না মেনে নিজেদের মতো যানবাহনের চাহিদা ও ব্যয় ধরা হয়েছে। ৬৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ব্যয়ের তালিকায় যানবাহন ও ব্যয়ের পুরোটা নিয়েই আপত্তি তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। প্রস্তাবনায় সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই ১৮টি জিপ, ১০টি মাইক্রোবাস, পাঁচটি বাস, চারটি কার, পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্স, পাঁচটি প্যাট্রলিং ভেহিকল, তিনটি ট্রাক, একটি মেইনটেন্যান্স ট্রাক, একটি রোড ক্লিনার কার, চারটি স্পিডবোট ও ১০টি মোটরসাইকেল ক্রয়ের কথা বলা হয়েছে। আবার কোনো রকম যাচাই-বাছাই ছাড়াই ভূমি অধিগ্রহণে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৫১ কোটি টাকা। অঙ্গভিত্তিক ব্যয় নির্ধারণ না করে প্রতিটি খাতে ধারণামতো প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে পূর্ত নির্মাণ এবং বিভিন্ন ধরনের সরবরাহ ও সেবার ক্ষেত্রে।
পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক বিভাগের সদস্য জিয়াউল ইসলাম বলেন, পরিকল্পনা কমিশন কেবল নতুন প্রকল্পের ক্ষেত্রে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রস্তাবনা অনুমোদন করে। কখনো ব্যয় সংকোচন বা প্রসারণ ও প্রকল্পের সময় বৃদ্ধির বিষয়গুলোও দেখভাল করে।
উল্লেখ্য, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট ও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এ চুক্তি করে। নির্মাণকাজ শেষে ২০২৩ সালে একটি ইউনিটের উত্পাদনে আসার কথা রয়েছে। অন্য ইউনিটটির উত্পাদনে আসার কথা ২০২৫ সালে।

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 64 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ