৯২ বছর ধরে বিনা মূল্যে দুপুরের খাবার

Print

নবাবপুরের মদনমোহন পাল অন্নছত্রে গরিব লোকজনকে খাবার দেওয়া হচ্ছে। গতকালের ছবি l প্রথম আলোঘড়িতে বেলা ১১টার কিছু বেশি। নবাবপুর রোডের দুপাশের হার্ডওয়্যারের দোকানগুলোর ভেতর দিয়ে সরু গলিটি এঁকেবেঁকে এসে থেমেছে বহু পুরোনো এক মন্দিরের দরজায়। ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে, সংকীর্ণ করিডরের দুপাশে থালা হাতে সারি দিয়ে বসেছেন নানা বয়সের জনা পঞ্চাশেক নারী-পুরুষ। এক পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় আরও প্রায় ৩০ জন।
খানিক পর ভেতর থেকে তিনটি বড় লোহার বালতি হাতে কয়েকজন বেরিয়ে এলেন। সারি দিয়ে বসা সবার পাতে একে একে পড়ল ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, পাঁচ রকমের সবজির তরকারি আর ডাল। খেয়ে উঠে গেল একদল। তাদের জায়গায় পাত পেড়ে বসলেন অপেক্ষমাণেরা।
পুরান ঢাকার ১০৯ নবাবপুর রোডের নিয়মিত দৃশ্য এটি। ৯২ বছর ধরে এভাবেই প্রতিদিন অভুক্তের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে মদনমোহন অন্নছত্র ট্রাস্ট।
ট্রাস্টের শুরুর গল্পটা জানা গেল ব্যবস্থাপক পরিমল কৃষ্ণ ভট্টাচার্যের কাছে। ১৯২৪ সাল। হঠাৎ খাদ্যাভাব দেখা দিল ঢাকায়। প্রতিদিন না খেয়ে থাকছে বহু লোক। নবাবপুরের স্থানীয় জমিদার মদনমোহন পালের তিন ছেলে রজনীকান্ত পাল, মুরলীমোহন পাল আর প্রিয়নাথ পাল ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য তাঁদের বাবার নামে একটি অন্নছত্র খুললেন। প্রতিদিন ১২৫ জনকে বিনা মূল্যে দুপুরবেলা খাওয়ানোর ভার নিলেন তাঁরা।
পরিমল কৃষ্ণ ভট্টাচার্য বললেন, ‘মানুষের কষ্ট দেখে তাঁদের খুব খারাপ লাগে। তাই বাবার নামে মদনমোহন পাল অন্নছত্র ট্রাস্ট এস্টেট গঠন করলেন। নিজেদের নয়টা বাড়ি লিখে দিলেন ট্রাস্টের নামে। নয়টা বাড়ি এখন নয়টা মার্কেট। সেই আয় দিয়েই ট্রাস্ট চলছে। এখানে ধর্ম-জাত-পাতের কোনো ভেদাভেদ নেই। ক্ষুধার্ত অবস্থায় যিনি আসবেন, তিনিই খেতে পাবেন।’
১২৫ জন দিয়ে অন্নছত্র শুরু হলেও এখন রোজ দুপুরে প্রায় ২০০ জনের রান্না হয়। পাচক স্বপন চক্রবর্তী বললেন, ৩৫ কেজি চাল, ১ মণ সবজি আর ৬ কেজি ডাল রান্না করেন তিনি। অন্নছত্রের শুরু থেকে এ তিনটি পদই রান্না হয়ে আসছে।
গতকাল সোমবার গিয়ে দেখা যায়, নবাবপুরে পাল পরিবারের শ্রীশ্রী রাধাশ্যাম জিউ ঠাকুর বিগ্রহ মন্দির ভবনে বেলা সাড়ে ১১টা থেকে খাবার বিতরণ শুরু হয়েছে। একের পর এক মানুষ আসছেন। বেশির ভাগই সেখানে বসে খাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার বাটিতে করে নিয়েও যাচ্ছেন।
অন্নছত্রের একজন নিয়মিত অতিথি মালেক মিয়া। বয়স ষাটের কোঠা পেরিয়েছে। চোখে দেখেন না। কী করেন জানতে চাইলে বলেন, ‘চাইয়া মাইঙ্গা খাই’। মালেক বললেন, এখানকার খাবার বেশ ভালো। তাই দুপুরের খাবার নিয়মিত এখানেই খান। বললেন, ‘যে বাবুর নামে অন্নছত্র, তাঁর জন্য প্রাণ ভইরা দোয়া করি।’
শুধু ভিখারি বা দরিদ্ররাই নন, মোটামুটি আয়ের অনেকেও এই অন্নছত্রের খাবার নিয়মিত খেয়ে থাকেন। নবাবপুরে বিভিন্ন দোকানে যন্ত্রাংশের সরবরাহকারী অসীম দাশ দুপুরের খাবার এখান থেকেই টিফিন বাটিতে করে নিয়ে যান। অসীমের পরিবার চট্টগ্রামে থাকে। তাই রেঁধে খাওয়ানোর লোক নেই। বললেন, ‘এখানে খেয়েই তো প্রাণ বাঁচে।’
মাসের দুই একাদশী (চাঁদের একাদশ দিন) আর জন্মাষ্টমী বাদে সারা বছর বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত এখানে খাবার বিতরণ হয়। তবে নির্ধারিত সময়ের পর কেউ এলে তাঁকেও ফেরানো হয় না। ট্রাস্টের সেবকেরা বললেন, তখন তাঁরা নিজেদের খাবারটুকু সেই অতিথিকে দিয়ে দেন। আর নিজেরা নতুন করে রেঁধে খান। ট্রাস্টের উইলে বলা আছে, কাউকে ফেরানো হবে না।
মদনমোহন পাল অন্নছত্র ট্রাস্টের বর্তমান প্রধান নির্বাহী দীপক কুমার পাল। সহকারী নির্বাহী তপন কুমার পাল। আর নির্বাহী সদস্য হিসেবে আছেন মিন্টু রঞ্জন পাল। মদনমোহনের বংশধর তাঁরা। উইল অনুসারে বংশধরেরাই ট্রাস্টের দায়িত্ব নেবেন। তবে বংশের যদি কেউ না থাকে, ঢাকার জেলা প্রশাসক তখন ট্রাস্টের প্রধান হবেন।
অন্নছত্রে সেবক হিসেবে আছেন সুখরঞ্জন পাল (৬৫)। তাঁর বাবাও এখানে কাজ করতেন। বয়স হয়েছে বলে এখন ছেলেকেও নিয়ে এসেছেন তাঁকে সাহায্য করার জন্য। তবু তিনি প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থেকে খাবার বিতরণের তদারক করেন। বললেন, ‘মানুষের সেবাই তো বড় ধর্ম। যে, যে ধর্মেরই হোক, তাদের সেবা করে মরতে পারলে জীবন ধন্য।’

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 43 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ